স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার লড়াই: হাজার টাকার পুঁজিতে ক্ষুদ্র ব্যবসা

শফিক শামীম: জীবন মানেই সংগ্রাম। কারও সংগ্রাম বড়, কারও ছোট। কিন্তু প্রতিটি সংগ্রামের পেছনেই থাকে টিকে থাকার এক অদম্য গল্প। রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, ফুটপাত কিংবা অলিগলির মোড়ে চোখে পড়ে এমন অনেক মানুষকে, যারা অতি সামান্য পুঁজি নিয়েই জীবনের চাকা ঘোরানোর চেষ্টা করছেন। কারও মূলধন মাত্র এক হাজার টাকা, আবার কারও চারশ কিংবা পাঁচশ টাকা। কিন্তু এই সামান্য পুঁজিই তাদের কাছে বড় স্বপ্নের ভিত্তি।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অল্প পুঁজিতে ক্ষুদ্র ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন অনেক মানুষ। কেউ বিক্রি করছেন ফল, কেউ চা-বিস্কুট, কেউবা ছোটখাটো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। দিনের শুরুতেই তারা বাজারে গিয়ে অল্প কিছু মাল কিনে আনেন। সেই মাল বিক্রি করেই দিনের শেষে দুই-তিনশ টাকা আয় করার চেষ্টা করেন।

মিরপুর গোদারা ঘাট এক অলিগলিতে দেখা মেলে খোদেজা নামের এক নারী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর। বসে আছেন সামান্য কিছু সবজি সামনে নিয়ে। অল্প অল্প করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। তেমন কোন ক্রেতাও চোখে পড়ছে না। খোদেজার চোখে-মুখে চিন্তার ভাজ। প্রতিদিন সকালে মাত্র এক হাজার টাকা দিয়ে কিছু সবজি কিনে আনেন তিনি। তারপর সেগুলো বিক্রি করেন মিরপুর গোদারা ঘাট এলাকার একটি গলিতে।

খোদেজা বলেন, আমার বড় কোনো পুঁজি নেই। প্রতিদিন হাজার টাকার সবজি কিনে আনি। সব বিক্রি করতে পারলে দুইশ থেকে তিনশ টাকা লাভ থাকে। সেই টাকা দিয়েই সংসার চালাতে হয়। আবার কখনো লোকসানও গুনতে হয়।

খোদেজার মতো এমন হাজারো মানুষ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসা করছেন। কেউ বিক্রি করছেন পান-সিগারেট, কেউ মোবাইল চার্জিংয়ের সেবা দিচ্ছেন, আবার কেউ চটপটি বা ফুচকা বিক্রি করছেন। অল্প পুঁজিতে এসব ব্যবসাই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

খোদেজার সামনে হাসমত-আলেয়া দম্পতি সবজি সুন্দর করে সাজাচ্ছেন। তারাও এই খোলা জায়গায় সবজি বিক্রি করেন। এই সামান্য জিনিস দিয়েই তার ব্যবসা। কোনমতে ৩ জনের সংসার চলে। তবে ভাল খাবার ও পোশাক কখনো পান না। মাঝেমধ্যে কোনো দানশীল ব্যক্তিরা সহযোগিতা করলে পান।

হাসমত বলেন, “ক্যাশ নেই। যা আছে তাই দিয়ে কোনমতে চলি। প্রতিদিন দুই-তিনশ টাকা আয় হয়। এতে সংসার কোন মত চলে যায়। তবে ঘর ভাড়া দিতে গিয়ে বিপদে পরে যাই।

এই বাজারে অল্প পুঁজির ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেশি দেখা মেলে। এখানে যারা ক্রয় করতে আসেন তারাও নিম্মআায়ের মানুষ।

এ সময় মধ্যবয়স্ক রোজিনা বেগম নামের এক নারী বলেন, আমার কোন সন্তান নেই। স্বামী ৮ বছর আগে মারা গেছে। আয় রোজগারের কেউ নেই। তাই বাধ্য হয়ে আমাকে পেট চালানোর জন্য এই অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজে আসতে হয়।

তিনি জানান, মাত্র চারশ টাকা দিয়ে শাক-পাতা এনে বিক্রি করি। সব বিক্রি করতে পারলে এক/দেড়শত টাকা লাভ হয়। তাই দিয়ে কোনমতে চলি।

রোজিনা বেগম বলেন, দিনে দুই-তিনশ টাকা আয় হলে সংসারে একটু স্বস্তি আসে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ক্ষুদ্র এই ব্যবসাগুলো দেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ক্ষুদ্র উদ্যোগ অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে এবং পরিবারগুলোকে টিকে থাকতে সাহায্য করে।

তাদের মতে, অল্প পুঁজির এই ব্যবসায়ীরা যদি সামান্য আর্থিক সহায়তা বা প্রশিক্ষণ পান, তাহলে তারা আরও ভালোভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। এতে তাদের আয় বাড়বে এবং অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাস্তবে দেখা যায়, এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। কখনো পুঁজি কম থাকে, কখনো জায়গা নিয়ে সমস্যা হয়, আবার কখনো আইনশৃঙ্খলা বা উচ্ছেদের ভয় থাকে। তবুও এসব বাধা তাদের থামাতে পারে না। কারণ তাদের সামনে থাকে পরিবারের দায়িত্ব, সন্তানের ভবিষ্যৎ আর বেঁচে থাকার তাগিদ।

ঢাকার ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড, বাজার কিংবা অলিগলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এসব ছোট ব্যবসায়ীরা আসলে একেকজন সংগ্রামী মানুষ। তাদের কাছে এক হাজার টাকা শুধু পুঁজি নয়—এটি স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র অবলম্বন।

প্রতিদিন সকালে নতুন আশায় তারা ব্যবসা শুরু করেন। দিন শেষে হয়তো বড় কোনো লাভ হয় না, কিন্তু সামান্য কিছু আয় নিয়ে ঘরে ফেরেন। সেই আয় দিয়েই চলে সংসার, কেনা হয় সন্তানের খাতা-কলম, জোটে পরিবারের একবেলার খাবার।

জীবনের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও তারা হার মানেন না। বরং প্রতিদিন নতুন করে লড়াই করেন। এক হাজার টাকার পুঁজি নিয়েও তারা প্রমাণ করে দিচ্ছেন—ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে ছোট শুরু থেকেও বড় স্বপ্ন দেখা যায়।

—জা. অর্থনীতি/এনজে