জ্যোৎস্না, বৃষ্টি আর নভেম্বরের জাদুকর— হ‍ুমায়ূন আহমেদ

দীপু মাহমুদ: এমন মানুষ আছেন, চলে গেলেও তার গল্প থেকে যায়। জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটার মতো নিঃশব্দে। জ্যোৎস্নার মতো মায়াময় হয়ে। আর প্রিয় কোনো বইয়ের পাতার মতো বারবার ফিরে আসার ডাক দিয়ে। হ‍ুমায়ূন আহমেদ তেমন একজন মানুষ। এই নাম উচ্চারণ করলেই বাঙালির মনে ভেসে ওঠে অবাক চাঁদের আলো, বৃষ্টি ভেজা বিকাল, এককাপ ধোঁয়া ওঠা চা, অকারণ হাসি, আচমকা নেমে আসা মন খারাপ করা সময় আর গল্পের ভেতর হারিয়ে যাওয়ার তুমুল আনন্দ। হ‍ুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির জগৎ আমাদের খুব চেনা, আশ্চর্য রকমের জাদুময়। সেখানে সাধারণ মানুষ অসাধারণ হয়ে ওঠে, নীরবতা কথা বলে, বৃষ্টি অতল স্মৃতি জাগিয়ে তোলে আর জ্যোৎস্না মনের একান্ত দরজায় কড়া নেড়ে যায়। তাই নভেম্বর এলেই মনে হয়, এ মাসটা যেন অন্য সব মাসের চেয়ে একটু বেশি আপন, একটু বেশি নরম, একটু বেশি গল্পময়।

হ‍ুমায়ূন আহমেদ মানেই জ্যোৎস্না
জ্যোৎস্নার প্রতি হ‍ুমায়ূন আহমেদের ভালোবাসা গভীর, নির্মল এবং একান্ত নিজস্ব। তার গল্প-উপন্যাসে চাঁদের আলো কখনও নিছক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হয়ে আসেনি। কখনও তা প্রেমের ভাষা, কখনও নিঃসঙ্গতার সঙ্গী, কখনও মনের অপ্রকাশিত কথাগুলো বলে যাওয়া এক রহস্যময় চরিত্র হয়ে গেছে। তার উপন্যাস ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ কিংবা ‘দারুচিনি দ্বীপ’-এর আবহে জ্যোৎস্না যেন গল্পের চরিত্রদের অনুভূতি ও স্মৃতির সঙ্গে মিশে গেছে।

হ‍ুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়তে গিয়ে মনে হয়, পৃথিবীর সব ব্যস্ততা একদিন দূরে সরিয়ে রেখে চুপচাপ বসে থাকি চাঁদের আলোয়। কোনো তাড়া থাকবে না, সময়ের কোনো হিসাব-নিকাশ থাকবে না, শুধু থাকবে নরম জ্যোৎস্না, দূরের কোনো অচেনা শব্দ আর গল্পের ভেতর ধীরে ধীরে ডুবে যাওয়ার অসাধারণ আনন্দ। হ‍ুমায়ূন আহমেদের কলমে জ্যোৎস্না যেন আকাশ থেকে নেমে আসা আলো নয়, মানুষের ভেতরের একান্ত গহিন অনুভূতি।

হ‍ুমায়ূন আহমেদ মানেই বৃষ্টি
বৃষ্টির শব্দ, ভেজা রাস্তা, মেঘে ঢেকে যাওয়া আকাশ, জানালার পাশে একা বসে থাকা— এসবের মধ্যে হ‍ুমায়ূন আহমেদ খুঁজে পেয়েছেন বিচিত্র সব গল্প। তার লেখায় বৃষ্টি কখনও মন খারাপের সুর তোলে, কখনও প্রেমকে আরও কোমল করে, কখনও পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে দেয়, আবার কখনও একেবারে সাধারণ এক বিকালকে করে তোলে অসাধারণ। বৃষ্টি বিলাস নামটিই যেন তার বৃষ্টিময় কল্পনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

হ‍ুমায়ূন আহমেদের লেখা বই পড়ার সময় বৃষ্টি নামলে মনে হয়, প্রকৃতি আর গল্প মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। শুরু হয়েছে উৎসব। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ, ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর বইয়ের পাতায় ছড়িয়ে থাকা তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো— সব মিলিয়ে তৈরি হয়ে যায় এক অদ্ভুত মায়ার জগৎ। শ্রাবণ ‘মেঘের দিন’ কিংবা ‘কোথাও কেউ নেই’ পড়ার সময়ও বৃষ্টি, মেঘ আর বিষণ্নতা গল্পের আবহকে আরও গভীর করে তোলে। যেন বৃষ্টির প্রত্যেকটি ফোঁটার ভেতর লুকিয়ে আছে নতুন কোনো গল্পের শুরু, কোনো অসমাপ্ত প্রেম, কিংবা কোনো অদ্ভুত মানুষের অপ্রত্যাশিত কথা।

হ‍ুমায়ূন আহমেদ মানেই মানুষকে নতুন করে দেখা
হ‍ুমায়ূন আহমেদ আমাদের শিখিয়েছেন, মানুষকে বোঝার জন্য সব সময় বড় বড় ঘটনা দরকার হয় না। কারও চুপ করে থাকা, অকারণে হেসে ওঠা, একা জানালার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা হঠাৎ কোনো অদ্ভুত কথা বলে ফেলা— এসবের মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে এক বিশাল জীবন। হ‍ুমায়ূন আহমেদের চরিত্ররা কেউ নিখুঁত নয়। তার অতি সাধারণ মানুষের মতো অসম্পূর্ণ, দ্বিধাগ্রস্ত, হাস্যকর, সংবেদনশীল এবং গভীরভাবে মানবিক।

হিমুর উদাসীনতা, মিসির আলির যুক্তি, শুভ্রর সরলতা কিংবা তার অসংখ্য সাধারণ মানুষের ছোট ছোট স্বপ্ন— সবকিছু মিলিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে এমন এক জগৎ তৈরি করেছেন, যেখানে পাঠক শুধু গল্প পড়ে না, চরিত্রগুলোর সঙ্গে হাঁটে, হাসে, কাঁদে এবং কখনও কখনও নিজের অচেনা দিকটিরও সন্ধান পায়। ‘ময়ূরাক্ষী’, ‘দেবী’, ‘শুভ্র’ এবং ‘আজ রবিবার’-এর মতো রচনায় এই চরিত্রগুলোর স্বাতন্ত্র্য ও মানবিকতা বিশেষভাবে ধরা পড়ে।

আর নভেম্বর! নভেম্বর হলো এই জাদুকরকে ফিরে পাওয়ার মাস
১৩ নভেম্বর হ‍ুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন। বছর ঘুরে এই দিনটি এলেই মনে হয়, বাংলা সাহিত্যের একজন ভীষণ প্রিয় গল্পকারকে ঘিরে আনন্দ করার, তার সৃষ্টির কাছে ফিরে যাওয়ার এবং তার রেখে যাওয়া মায়াকে নতুন করে অনুভব করার দারুণ এক উপলক্ষ এসেছে।

এই দিনে প্রিয় বইটি আবার খুলে বসা যায়। বহুদিনের বন্ধুকে তার লেখা বই উপহার দেওয়া যায়। হিমু কিংবা মিসির আলিকে নিয়ে আড্ডা জমতে পারে। তার কোনো নাটক বা সিনেমার প্রিয় দৃশ্য আবার দেখা যেতে পারে— যেমন: ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’ কিংবা ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’। কিংবা নিঃশব্দে একা বসে তার লেখা পড়তে পড়তে মনে করা যায়— কীভাবে একজন মানুষ এত সহজ ভাষায় আমাদের এত গভীর অনুভূতির কাছে পৌঁছে গেছেন!

হ‍ুমায়ূন আহমেদের ছোটবেলায় জন্মদিনে বাড়িতে উৎসবের আমেজ থাকত। তিনি উপহার পাওয়ার চেয়ে অতিথিদের কথাবার্তা, বাড়ির ব্যস্ততা আর চারপাশের ছোট ছোট ঘটনাই বেশি আগ্রহ নিয়ে খেয়াল করতেন। পরে সেইসব সাধারণ দৃশ্যই তার গল্পের মতো হয়ে ওঠে— যেখানে হাসি আছে, কৌতুক আছে, আবার মানুষের অদ্ভুত স্বভাবের মায়াময় পর্যবেক্ষণও আছে। জন্মদিনের আনন্দকে তিনি কখনও কেবল কেক, উপহার বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আটকে রাখেননি। মানুষের সঙ্গে থাকা, তাদের কথা শোনা এবং জীবনের সামান্য ঘটনায় আনন্দ খুঁজে নেওয়াই যেন তার কাছে ছিল আসল উৎসব।

তাই হ‍ুমায়ূন আহমেদের জন্মের উদ্‌যাপনের জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। একটি বই, এক কাপ চা, জানালার বাইরে বৃষ্টি কিংবা আকাশভরা জ্যোৎস্নাই যথেষ্ট। হ‍ুমায়ূন আহমেদ আছেন আমাদের জীবনের খুব কাছের একজন গল্পকার হয়ে। তার গল্প উপন্যাসের সব চরিত্রই আমাদের চারপাশের পরিচিত মানুষ। হয়তো পাশের বাড়ির, হয়তো বন্ধুর মতো, কিংবা নিজের মনেরই কোনো একান্ত কণ্ঠস্বর।

হ‍ুমায়ূন আহমেদের লেখার জাদু এখানেই— তিনি খুব সাধারণ মুহূর্তের ভেতরেও অসাধারণ সৌন্দর্য খুঁজে নিতে শিখিয়েছেন। কোনো এক বৃষ্টিভেজা দুপুর, চাঁদনি রাত, নির্জন বারান্দা কিংবা নিস্তব্ধ নভেম্বরের বিকাল তার গল্পের ছোঁয়ায় হয়ে ওঠে একান্ত নিজের, গভীর মায়ায় ভরা স্মৃতি। ‘নন্দিত নরকে’ কিংবা ‘আগুনের পরশমণি’-র মতো উপন্যাসেও সাধারণ মানুষের জীবন, সম্পর্ক ও অনুভূতি অসাধারণ গভীরতায় ধরা পড়ে।

তিনি আমাদের শেখান, আনন্দ সব সময় বড় কোনো ঘটনার মধ্যে থাকে না। কখনও তা লুকিয়ে থাকে পুরোনো বইয়ের পাতায়, বন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডায়, হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া কোনো চরিত্রে, কিংবা একা বসে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকার মুহূর্তে। তার গল্প আমাদের সেই ছোট ছোট আনন্দগুলো চিনতে শিখিয়েছে। 

হ‍ুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির আরেকটি বড় শক্তি হচ্ছে তার ভাষার স্বাভাবিকতা। তিনি কঠিন অনুভূতিকে সহজ বাক্যে, গভীর বিষণ্নতাকে হালকা রসিকতায় এবং জীবনের জটিলতাকে পরিচিত কথোপকথনের ভেতর দিয়ে স্বাভাবিকভাবে তুলে ধরতে পারেন। ফলে তার লেখা পড়লে মনে হয়, গল্পটি যেন দূরের কোনো সাহিত্যিক জগতের নয়, আমাদের ঘরের, আমাদের পাড়ার, আমাদের প্রতিদিনের জীবনেরই অংশ। এই আপন করে নেওয়ার ক্ষমতাই তাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের পাঠকের কাছে এত প্রিয় করে রেখেছে।

তাই এই নভেম্বর হোক বইয়ের, গল্পের, জ্যোৎস্নার আর বৃষ্টির। প্রিয় মানুষদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হোক হ‍ুমায়ূন আহমেদের লেখা থেকে পাওয়া আনন্দ। প্রিয় চরিত্রদের নিয়ে জমুক আড্ডা। পুরোনো বইয়ের তাক থেকে বেরিয়ে আসুক তার কোনো উপন্যাস— হিমু, মিসির আলি অমীমাংসিত, দেবী কিংবা ‘জোছনা ও জননীর গল্প’। আর নতুন করে আবিষ্কৃত হোক তার গল্পের সেই চিরচেনা, অথচ প্রতিবারই নতুন মনে হওয়া জাদু।

হ‍ুমায়ূন আহমেদ নেই, কিন্তু তার গল্প আছে। তার চরিত্ররা আছে। তার তৈরি করা জ্যোৎস্না আছে, বৃষ্টি আছে, অদ্ভুত সব মানুষ আছে, আর আছে আমাদের মনের ভেতর জমে থাকা অসংখ্য স্মৃতি। যতদিন বাঙালি পাঠক বই খুলে বসবে, যতদিন বৃষ্টির দিনে কেউ জানালার পাশে দাঁড়াবে, যতদিন জ্যোৎস্না দেখে কারও মনে গল্প জাগবে— ততদিন হ‍ুমায়ূন আহমেদ আমাদের সঙ্গে থাকবেন।

শুভ জন্মদিন, হ‍ুমায়ূন আহমেদ। জ্যোৎস্না থাকুক, বৃষ্টি থাকুক, নভেম্বর বারবার ফিরে আসুক— আর থাকুক আপনার গল্পে মুগ্ধ হওয়ার সেই চিরকালীন আনন্দ।