জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: মানুষের জীবন সহজ করতে তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা থেকে শুরু করে সাইবার নিরাপত্তা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে এর ব্যবহার। কিন্তু, এই প্রযুক্তিই যদি একদিন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়?
এমন আশঙ্কা থেকেই একের পর এক পদত্যাগ করছেন এআই নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা। গুগল ডিপমাইন্ডের জশ এঙ্গেলস ও বিলাল চুগতাই এবং অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সনের সতর্কবার্তা নতুন করে সামনে এনেছে এআইয়ের নিরাপত্তার প্রশ্ন। কেন প্রযুক্তি তৈরির সঙ্গে যুক্ত গবেষকেরাই এখন উদ্বিগ্ন? এআইয়ের ঝুঁকি কতটা বাস্তব? আর এই প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে কে?
পরপর পদত্যাগ
গুগল ডিপমাইন্ডের এজিআই সেফটি ও অ্যালাইনমেন্ট গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জশ এঙ্গেলস ও বিলাল চুগতাই। তাদের কাজের ক্ষেত্র ছিল, আরও উন্নত এআই ব্যবস্থা যেন মানুষের উদ্দেশ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করে, তা নিশ্চিত করা। কিন্তু তাদের আশঙ্কা, এআইয়ের সক্ষমতা যে গতিতে বাড়ছে, সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না নিরাপত্তা গবেষণা।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগের কথা প্রকাশ্যে জানান জশ এঙ্গেলস। তার আশঙ্কা, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই এআই থেকে বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পরে তিনি এআই নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা স্বাধীন গবেষণা সংস্থা এমইটিআর—মেট্র-এ যোগ দেওয়ার কথা জানান।
একই মাসে পদত্যাগের ঘোষণা দেন বিলাল চুগতাইও। তার মতে, এআইয়ের সক্ষমতা বাড়ছে দ্রুত, অথচ এই প্রযুক্তিকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখার সমাধান এখনও যথেষ্ট উন্নত নয়। তবে তাদের বক্তব্য ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ব্যক্তিগত মূল্যায়ন—নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
আসল ভয় কোথায়?
এখন প্রশ্ন হলো, এআই কি সত্যিই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে? এখানে আলোচনায় আসে এজিআই বা আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স। অর্থাৎ, এমন উন্নত এআই, যা মানুষের মতো বিভিন্ন ধরনের কাজে দক্ষ হতে পারে। আর সুপারইন্টেলিজেন্স বলতে বোঝায় এমন ব্যবস্থা, যা প্রায় সব ক্ষেত্রেই মানুষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এ ধরনের প্রযুক্তি এখনও কী পর্যায়ে পৌঁছাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে গবেষকদের উদ্বেগ, ভবিষ্যতের এআই নিজেই জটিল পরিকল্পনা করতে, বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থা ব্যবহার করতে এবং নিজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হলে ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
সমস্যা তৈরি হবে, যদি এআইয়ের কাজ মানুষের উদ্দেশ্যের সঙ্গে না মেলে, অথচ তাকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া বা বাস্তব ব্যবস্থায় কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। এতে করে, অনুমোদনহীন কাজ কিংবা সাইবার হামলার মতো ঘটনায় ক্ষতির মাত্রা অনেক বেড়ে যেতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের গবেষকের সতর্কতা
একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন, অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগের কথা জানিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠান উন্নত এআই তৈরির প্রতিযোগিতায় নিরাপত্তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।
কক্সনের আশঙ্কা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে—এমন শক্তিশালী এআই তৈরি হলে পরিস্থিতি সামলানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে এআইয়ের ঝুঁকি শুধু ভবিষ্যতের সম্ভাবনায় সীমাবদ্ধ নয়। এর অপব্যবহারে ভুয়া তথ্য ছড়ানো, প্রতারণা, সাইবার অপরাধ এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মতো সমস্যাও রয়েছে।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক এআই সেফটি রিপোর্টেও বলা হয়েছে, সাধারণ কাজে ব্যবহৃত এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। কিছু ঝুঁকির প্রমাণও বেড়েছে। তবে ঝুঁকি কতটা গুরুতর হবে এবং বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
গতি কমানোর প্রস্তাব
এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ শুধু গবেষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও আমোডিও উন্নত এআই তৈরির গতি নিয়ন্ত্রিত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি প্রস্তাব দেন, উন্নত এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়নকারীদের কাজের সুযোগ দিতে হবে। তাদের পর্যাপ্ত তথ্য ও প্রবেশাধিকার থাকতে হবে, যাতে এআইয়ের ঝুঁকি যাচাই করে প্রয়োজন হলে সতর্ক করতে পারেন।
ওপেন এআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানও স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের এ ধরনের ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানান। তবে স্বাধীন মূল্যায়ন কতটা কার্যকর হবে, মূল্যায়নকারীরা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন এবং তাদের সুপারিশ বাস্তবায়ন কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব প্রশ্নের সমাধান এখনও জরুরি। কারণ, এআইয়ের উন্নয়ন ধীর করার উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার হিসাবও।
এআই কি একদিন মানবজাতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে? নাকি কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও যথাযথ নজরদারির মাধ্যমে এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে? এর নিশ্চিত উত্তর এখনও নেই।
তবে গবেষকদের পদত্যাগ ও সতর্কবার্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে, প্রযুক্তির সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, সেই প্রযুক্তিকে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থাও কি তত দ্রুত এগোচ্ছে? কারণ, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু কে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই তৈরি করবে, তা নিয়ে নয়। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, সেই শক্তি যেন মানুষের কল্যাণেই ব্যবহৃত হয়। এআইয়ের ভবিষ্যৎ তাই শুধু প্রযুক্তির অগ্রগতির গল্প নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, দায়িত্বশীলতা এবং নিয়ন্ত্রণেরও প্রশ্ন।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
