কৃষিবিদ মো. সালমুন হাসান বিপ্লব
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক সংকট, সিপাহি-জনতার ঐক্য, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রত্যাবর্তন এবং ইতিহাসের সংকটকালীন নেতৃত্বের আলোকে বাংলাদেশের এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।
ইতিহাসের কিছু দিন শুধু ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে থাকে না; একটি জাতির রাজনৈতিক গতিপথ, রাষ্ট্রীয় পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান, নেতৃত্বের সংকট এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই দিনের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, জেড ফোর্সের অধিনায়ক এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ১৯৬২ সালের ১৩ মার্চ এক ভাষণে বলেছিলেন, “Those who make peaceful revolution impossible will make violent revolution inevitable.” অর্থাৎ, শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ করা হলে সহিংস পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাঁর এই বক্তব্য রাষ্ট্রীয় সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বাংলাদেশের ১৯৭৫ সালের ঘটনাপ্রবাহও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্বের মধ্যে গভীর সংকট তৈরি হলে তার অভিঘাত রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের পরিচয় অবশ্য ৭ নভেম্বর থেকে শুরু হয়নি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সামরিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যার পর তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। পরবর্তী সময়ে সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে অর্জিত সামরিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং শৃঙ্খলা তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে সেই পরিচয় নতুনভাবে সামনে আসে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর দেশে গভীর রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ, নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ক্রমেই পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এই অভ্যুত্থানের পর সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়।
দেশ তখন কার্যত এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির মধ্যে আটকে পড়ে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেতৃত্বের পরিবর্তন, সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে বিভক্তি এবং ধারাবাহিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছিল। এমন পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসে সৈনিক বিদ্রোহ শুরু হয়। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা বিদ্রোহে অংশ নেন। তাঁদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের একটি অংশও রাজপথে যুক্ত হয়। সৈনিকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে—‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ স্লোগান।
এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাঁকে মুক্ত করে পুনরায় নেতৃত্বের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। তাঁর মুক্তি ছিল ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর একটি। একজন মুক্তিযোদ্ধা সেনাপ্রধান, যিনি কয়েক দিন আগেও সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে গৃহবন্দি ছিলেন, তিনি আবারও সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ফিরে আসেন। তাঁর মুক্তি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক উত্থান বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
এখানেই জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকার একটি বিশেষ দিক সামনে আসে। তিনি এমন এক সময়ে জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন, যখন রাষ্ট্রের প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামো ভেঙে পড়েছিল, সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছিল এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে শুধু গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করেনি; বরং তাঁকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। এই প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানকে একজন ‘Crisis Leader’ বা সংকটকালীন নেতা হিসেবে বিশ্লেষণ করার ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। সংকটের মুহূর্তে নেতৃত্বের উত্থান, জনসম্পৃক্ততা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস—এই তিনটি বিষয় তাঁর ৭ নভেম্বরের ভূমিকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলার মাটিতেও সংকটকালে জনসমর্থন ও সম্মিলিত উদ্যোগে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি প্রাচীন দৃষ্টান্ত রয়েছে। প্রায় ১২০০ বছর আগে, অষ্টম শতকে বাংলায় পালবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপালের ক্ষমতায় আরোহণ তেমনই একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক শাসকদের দ্বন্দ্ব এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অনুপস্থিতি বিরাজ করছিল। ইতিহাসে এই পরিস্থিতি ‘মাৎস্যন্যায়’ (Matsyanyaya) নামে পরিচিত। এর অর্থ—বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে গ্রাস করে, তেমনি শক্তিশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দুর্বলদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে সমাজে যে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়, মাৎস্যন্যায় ছিল তারই প্রতীক।
এমন পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে বাংলার তৎকালীন প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও নেতৃত্বের সম্মিলিত উদ্যোগে গোপালকে রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয় বলে পালবংশের তাম্রশাসন ও ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। গোপালের পুত্র ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রশাসনে মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটাতে ‘প্রকৃতিগণ’ কর্তৃক গোপালকে রাজক্ষমতায় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। তবে ‘প্রকৃতি’ বলতে সাধারণ জনগণ, নাকি আঞ্চলিক প্রধান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বোঝানো হয়েছে, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আধুনিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সঙ্গে এই ঘটনাকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। তবু রাষ্ট্রীয় অরাজকতার মধ্যে সম্মিলিত উদ্যোগে একজন শাসককে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠার এই ঘটনা বাংলার ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত। [ঐতিহাসিক সূত্র: খালিমপুর তাম্রশাসন ও পালবংশের ইতিহাস।]
গোপালের ক্ষমতায় আরোহণ এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের কেন্দ্রে ফিরে আসার মধ্যে তাই একটি তুলনামূলক ঐতিহাসিক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। দুটি ঘটনা প্রায় বারো শতকের ব্যবধানে, সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় সংঘটিত হয়েছে। গোপালকে তৎকালীন প্রভাবশালী নেতৃত্বের সমর্থনে রাজা করা হয়েছিল; অন্যদিকে, ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান মুক্ত হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসেন। উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় সংকট, নেতৃত্বের শূন্যতা এবং নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ইতিহাসের ভাষায় বলা যায়, “Leadership often emerges at the crossroads of crisis and collective action.” অর্থাৎ, সংকট ও সম্মিলিত উদ্যোগের সন্ধিক্ষণ থেকেই অনেক সময় নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটে।
জিয়াউর রহমানের ৭ নভেম্বরের ভূমিকা বোঝার ক্ষেত্রে এই তুলনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ ইতিহাসে নেতৃত্ব সব সময় প্রচলিত ক্ষমতার ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। কখনো রাষ্ট্রীয় সংকট, কখনো জনগণের আন্দোলন, আবার কখনো সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত অবস্থানের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটে। জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে সিপাহি-জনতার বিদ্রোহ তাঁর মুক্তি এবং পরবর্তী ক্ষমতার উত্থানের পথ তৈরি করেছিল। ইংরেজিতে বলা যায়, “He emerged as a leader during a national crisis and was brought back to the centre of power through a popular uprising.” এই বাক্যটি ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে তাঁর ঐতিহাসিক অবস্থানকে সংক্ষেপে তুলে ধরে।
বিশ্ব ইতিহাসেও বিভিন্ন সময়ে সামরিক বাহিনীর একটি অংশ, সাধারণ জনগণ এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের সম্মিলিত অংশগ্রহণে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের ৭ নভেম্বরের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনায় পর্তুগালের ১৯৭৪ সালের Carnation Revolution বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ ৪৮ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটাতে পর্তুগালের Armed Forces Movement (MFA)-এর সামরিক কর্মকর্তারা অভ্যুত্থান শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে সাধারণ জনগণও ব্যাপকভাবে সেই আন্দোলনে অংশ নেয়। সৈনিকদের হাতে লাল কার্নেশন ফুল তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আন্দোলনটি শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতীকে পরিণত হয়। সামরিক উদ্যোগ, জনসমর্থন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা—এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের কারণে পর্তুগালের বিপ্লবের সঙ্গে বাংলাদেশের ৭ নভেম্বরের কিছু ঐতিহাসিক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। তবে পর্তুগালের বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ও গণতান্ত্রিক রূপান্তর; বাংলাদেশের ৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট ছিল স্বাধীনতার পর ধারাবাহিক সামরিক অভ্যুত্থান, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং জিয়াউর রহমানের মুক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বাস্তবতা।
ফিলিপাইনের ২২ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬ সালের People Power Revolution-ও বিশ্ব ইতিহাসে সামরিক বাহিনী ও জনগণের সম্মিলিত ভূমিকার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোসের শাসনামলে রাজনৈতিক সংকট ও নির্বাচনী বিতর্কের পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী জুয়ান পন্সে এনরিলে এবং জেনারেল ফিদেল রামোসসহ সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশ মার্কোসের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেন। তাঁদের সমর্থনে লাখো মানুষ রাজপথে নেমে আসে। শেষ পর্যন্ত মার্কোস ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এবং কোরাজন আকুইনো রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই আন্দোলন দেখিয়েছে, সামরিক বাহিনীর একটি অংশ ও জনগণের সম্মিলিত অবস্থান একটি দেশের রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। বাংলাদেশের ৭ নভেম্বরের সঙ্গে এর সাদৃশ্য হলো সামরিক বাহিনীর ভেতরের পরিবর্তন এবং জনগণের অংশগ্রহণ। তবে ফিলিপাইনের আন্দোলন ছিল মূলত নির্বাচনী বৈধতা ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে পরিচালিত গণআন্দোলন; বাংলাদেশের ৭ নভেম্বরের কেন্দ্রীয় ঘটনা ছিল সেনানিবাসের সৈনিক বিদ্রোহ ও জিয়াউর রহমানের মুক্তি।
একইভাবে ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিনের একদলীয় কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। পোল্যান্ড, পূর্ব জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া এবং রোমানিয়ায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে রোমানিয়ায় গণবিক্ষোভ, সামরিক বাহিনীর অবস্থান পরিবর্তন এবং সহিংস সংঘাতের মধ্য দিয়ে নিকোলাই চশেস্কুর শাসনের অবসান ঘটে। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো যখন জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তখন বড় ধরনের ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে বাংলাদেশের ৭ নভেম্বরের সঙ্গে এসব ঘটনার সরাসরি সমতুল্যতা নেই; তুলনাটি মূলত রাষ্ট্রীয় সংকট, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিক।
এই আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জনগণের আকাঙ্ক্ষা, সামরিক বাহিনীর অবস্থান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন। বাংলার গোপাল থেকে শুরু করে পর্তুগালের Carnation Revolution এবং ফিলিপাইনের People Power Revolution—বিভিন্ন সময়ের এসব ঘটনা দেখায়, সংকটকালে প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে থেকেও নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটতে পারে। বাংলাদেশের ৭ নভেম্বরও এই বৃহত্তর ঐতিহাসিক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
৭ নভেম্বরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই দিনটি সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের সম্পর্কের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক প্রতীক হয়ে ওঠে। সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের রাজপথে অংশগ্রহণ এবং পারস্পরিক সংহতির দৃশ্য পরবর্তী সময়ে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে পরিচিতি পায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দিনটি পরবর্তীকালে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই নামের মধ্যেই দিনটির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও প্রতীকী তাৎপর্য প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে শুধু জিয়াউর রহমানের মুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক চিত্র পাওয়া যাবে না। এই বিদ্রোহের পেছনে সৈনিকদের অসন্তোষ, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বৈষম্যবিরোধী দাবি এবং কর্নেল আবু তাহের ও তাঁর সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা ছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে ৭ নভেম্বরকে সামরিক বাহিনীর ভেতরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং সৈনিকদের বিপ্লবী রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত ফল হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফলে দিনটির ইতিহাস বহুমাত্রিক এবং এর ব্যাখ্যা নিয়েও রাজনৈতিক ও গবেষণামূলক বিতর্ক রয়েছে।
ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নে আরেকটি বেদনাদায়ক অধ্যায় স্মরণ করা প্রয়োজন। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দারসহ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। তাঁদের অনেকেই ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী। এসব হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে গভীর বেদনার অধ্যায়। তাই ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য আলোচনা করতে গেলে জিয়াউর রহমানের মুক্তি ও নেতৃত্বের পাশাপাশি সেই দিনের প্রাণহানি এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বাস্তবতাও স্মরণ করতে হবে।
জিয়াউর রহমানের জীবনের সঙ্গে ৭ নভেম্বরের সম্পর্ক ছিল ইতিহাসের এক নাটকীয় সন্ধিক্ষণ। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সামরিক অধিনায়ক; ১৯৭৫ সালে তিনি ছিলেন সেনাপ্রধান; আর ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এই তিনটি পরিচয়ের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর সামরিক নেতৃত্ব তাঁকে জাতীয় পরিচিতি দিয়েছিল, আর ৭ নভেম্বর তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। একজন সামরিক অধিনায়ক থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে তাঁর এই উত্তরণ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তর।
তবে বিপ্লবের সাফল্য শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়। একটি বিপ্লবের প্রকৃত ঐতিহাসিক মূল্যায়ন হয় তার পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, জনগণের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সংহতির ওপর তার প্রভাব দিয়ে। এই বিবেচনায় ৭ নভেম্বরের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ, সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতার রূপান্তর নিয়েও নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক আলোচনা প্রয়োজন।
আজ ৭ নভেম্বরের দিকে ফিরে তাকালে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। কারণ এই দিনের ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনেছিল। তাঁর মুক্তি, সেনাবাহিনীতে পুনরায় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক উত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একই সঙ্গে সিপাহি-জনতার অংশগ্রহণ, আবু তাহেরের ভূমিকা, সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড এবং ঘটনাটির বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৭ নভেম্বরের ইতিহাস কোনো একক রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তথ্য, দলিল ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীলতা মানে শুধু কোনো ব্যক্তির অবদান স্মরণ করা নয়; বরং সেই সময়ের সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, ভূমিকা ও পরিণতিকে যথাযথভাবে অনুধাবন করা।
বাংলাদেশের ৭ নভেম্বর তাই শুধু একটি সামরিক বিদ্রোহ কিংবা একজন সেনাপ্রধানের মুক্তির ঘটনা নয়; এটি স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় সংকট, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, জনসম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের এক জটিল ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। বাংলার ইতিহাসে গোপালের মতো সংকটকালে নেতৃত্বের উত্থানের দৃষ্টান্ত এবং বিশ্ব ইতিহাসের বিভিন্ন গণঅভ্যুত্থানের আলোকে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে জিয়াউর রহমানের ‘Crisis Leader’ হিসেবে আবির্ভাবের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।
৭ নভেম্বর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রের সংকটকালে নেতৃত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐক্য, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান। ইতিহাসের এই শিক্ষা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা ও নেতৃত্বের আলোচনাতেও প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।
লেখক: কৃষিবিদ মো. সালমুন হাসান বিপ্লব, বিসিএস (মৎস্য)
