সরকারি হিসাব ১ লাখ ৬০ হাজার, এজেন্সি চায় সাড়ে ৭ লাখ (ভিডিও)

সৈয়দ ইকবাল, ঢাকা: মালয়েশিয়ায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে একজন কর্মী পাঠাতে সম্ভাব্য ব্যয় ১ লাখ ৫৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অথচ বেসরকারি এজেন্সিগুলোতে কাজের ধরনভেদে চাওয়া হচ্ছে ৬ লাখ থেকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা। চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ, ভিসা প্রক্রিয়াকরণ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশনের নামে এই বাড়তি অর্থ চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে নতুন করে কর্মী পাঠানোর প্রস্তুতির মধ্যেই শ্রমবাজারে পুরোনো সিন্ডিকেটের প্রভাব থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বেসরকারি এজেন্সিতে চাওয়া সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ লাখ টাকা বোয়েসেলের সম্ভাব্য ব্যয় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার প্রায় ৪ দশমিক ৭ গুণ। তবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কর্মী পাঠানোর ব্যয় এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, এজেন্সিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে এই ব্যয় নির্ধারণ করা হবে।

 

রাজধানীর কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারখানায় কাজের জন্য ৭ লাখ, মেডিকেল সার্ভিসের কাজের জন্য সাড়ে ৭ লাখ এবং নির্মাণ খাতের জন্য ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। কর্মপ্রার্থীদের কাছ থেকে পাসপোর্টের সঙ্গে জামানত হিসেবে নেওয়া হচ্ছে ১ থেকে ২ লাখ টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাকরাইলের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সরকারি ফির বাইরে প্রতিটি ভিসার জন্য মালয়েশিয়ায় আরও ৫ হাজার রিঙ্গিত দিতে হচ্ছে। এরপর দেশের বিভিন্ন এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগীর কমিশন যুক্ত হয়ে কর্মীর ব্যয় বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানটি কারখানা, মেডিকেল সার্ভিস ও নির্মাণ খাতে কর্মী পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানায়।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, নিয়োগকর্তার কাছ থেকে চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহের পর তা একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী ও এজেন্সির হাত ঘুরে কর্মীর কাছে পৌঁছায়। প্রতিটি ধাপে কমিশন যুক্ত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এর বোঝা কর্মীর ওপর পড়ে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ভিসা প্রক্রিয়াকরণের নামেও বাড়তি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি ফি মানেই কর্মীর মোট ব্যয় নয়
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের প্রকাশিত তালিকায় উপদ্বীপীয় মালয়েশিয়ায় উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতে বার্ষিক লেভি ১ হাজার ৮৫০ রিঙ্গিত, অস্থায়ী কর্মসংস্থান পাসের ফি ৬০ রিঙ্গিত এবং প্রসেসিং ফি ১২৫ রিঙ্গিত। এই তিন খাতে মোট অর্থের পরিমাণ ২ হাজার ৩৫ রিঙ্গিত। কৃষি ও বাগান খাতে একই তিন ধরনের ফি মিলিয়ে পরিমাণ ৮২৫ রিঙ্গিত।

তবে এগুলো সব ধরনের ফিসহ একটি ভিসার মোট খরচ নয়। বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা ফি আরও ২০ রিঙ্গিত এবং নিরাপত্তা জামানত আলাদাভাবে ৫০০ রিঙ্গিত উল্লেখ রয়েছে। তা ছাড়া অভিবাসন বিভাগের ওয়েবসাইটে তালিকাটি অস্থায়ী কর্মসংস্থান পাস নবায়নের ফি অংশে দেওয়া হয়েছে। সাবাহ ও সারাওয়াকে লেভির হারও আলাদা। ফলে এই তালিকা দিয়ে প্রথমবার কর্মী নিয়োগের সম্পূর্ণ ব্যয় নির্ধারণ করা যায় না। 

অভিবাসন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিভাগটিতে প্রদেয় জামানত, ভিসা এবং বিদেশি কর্মীর লেভি ও পাসের অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব নিয়োগকর্তার। তাই এসব অর্থ সরাসরি কর্মীর অভিবাসন ব্যয়ে যুক্ত করার আগে নিয়োগচুক্তি ও ব্যয় বণ্টনের শর্ত বিবেচনায় নিতে হবে। 

বেসরকারি খাতের ব্যয় নির্ধারণের অপেক্ষা
বোয়েসেল সূত্রে পাওয়া সম্ভাব্য হিসাবে মালয়েশিয়ার এজেন্টের জন্য ৭৫ হাজার টাকা, বিমানভাড়া প্রায় ৪৫ হাজার, প্রশিক্ষণ ফি ২২ হাজার, স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ১০ হাজার এবং সাক্ষাৎকারসহ অন্যান্য খাতে ১০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই হিসাব দাঁড়ায় ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা। এটি সূত্রের দেওয়া হিসাব; চূড়ান্ত নির্ধারিত ব্যয় নয়।

গত বুধবার, ২৮ অক্টোবর রাজধানীর একটি হোটেলে অভিবাসনবিষয়ক সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, বোয়েসেলের সঙ্গে আলোচনা করে দেখা গেছে, একজন কর্মীর যেতে ১ লাখ ৫৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার মতো খরচ হতে পারে। বেসরকারি এজেন্সিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর ব্যয়ও নির্ধারণ করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, নভেম্বরের শুরুতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপর কর্মীরা যেতে পারবেন। ১ নভেম্বর বা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ফ্লাইট শুরু হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তালিকায় ৩৩৮ প্রতিষ্ঠান
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ১৫ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বোয়েসেল, ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি মিলিয়ে মোট ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেরাই মালয়েশিয়ায় নিয়োগকর্তা খুঁজতে, চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ করতে এবং বাংলাদেশে কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। কলিং ভিসা ও ই-ভিসাসংক্রান্ত প্রশাসনিক কাজে বোয়েসেল এবং ২৫টি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি সহায়তা দেবে। ফলে ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে ওই ২৫টি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন সাব–এজেন্সি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। 

একই বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগের বিষয়ে মালয়েশিয়ার নীতিগত সম্মতির কথাও জানানো হয়। 

এদিকে রাজধানীর ফকিরাপুল, পল্টন, কাকরাইল ও মতিঝিলের কয়েকটি এজেন্সিতে সরেজমিন দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা কর্মপ্রার্থীরা পাসপোর্ট জমা দিচ্ছেন। তাদের কাছ থেকে জামানত হিসেবে ১ থেকে ২ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা থাকলে ব্যয় ও সেবা মাশুলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কোন প্রতিষ্ঠান কোন কাজের জন্য কত টাকা নিচ্ছে তা স্পষ্ট না হলে কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়।

নজরদারি ও জবাবদিহির ঘাটতি
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর খরচ নিয়ে এমন বড় ব্যবধানের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অতিরিক্ত অর্থ আদায় শ্রমিকদের ঋণের বোঝা বাড়ায় এবং বিদেশে গিয়ে তাদের শোষণ ও অনিশ্চয়তার ঝুঁকিতে ফেলে।’

তিনি বলেন, ‘অতীতেও এ ধরনের অভিযোগ ওঠার পরও সমস্যার পুনরাবৃত্তি হওয়ার অর্থ হচ্ছে, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। সরকারকে অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে দায়ী এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

নিয়োগ ব্যয়ের স্বচ্ছ তালিকা প্রকাশ, এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত তদারক এবং কর্মীদের সরাসরি নিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি। একইসঙ্গে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়োগকর্তার চাহিদা, চুক্তির শর্ত ও কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

অতীতের অনিয়মের ছায়া
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে এর আগেও অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছে। ২০২২ সালে কর্মী পাঠানো শুরুর সময় বাংলাদেশ অংশে সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ ব্যয় ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। কিন্তু কর্মীদের কাছ থেকে এর কয়েক গুণ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের গড় ব্যয় ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই প্রতিবেদনে এই গড়ের মূল জরিপ ও সময়কাল স্পষ্ট করা হয়নি। 

অনুমোদিত কর্মীদের মালয়েশিয়ায় প্রবেশের শেষ সময় ছিল ২০২৪ সালের ৩১ মে। এই সময়সীমা বাংলাদেশসহ একাধিক কর্মী প্রেরণকারী দেশের জন্য প্রযোজ্য ছিল। ফলে ঘটনাটিকে শুধু বাংলাদেশের কর্মী নিয়োগ বন্ধের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখানো যথাযথ নয়। 

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোয় অনিয়মের অভিযোগে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পরবর্তী সময়ে আদালতে কার্যক্রম হয়েছে।

চলতি বছরের ২১-২২ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফর করেন। এরপর শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে দুই দেশের তৎপরতা চলতে থাকে। অক্টোবরে মন্ত্রণালয় নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দেয়। 

প্রযুক্তি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন
মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এফডব্লিউসিএমএস) সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট। প্রতিষ্ঠানটি ‘তুরাপ’ নামে নতুন একটি নিয়োগ প্ল্যাটফর্মের প্রস্তাবও দিয়েছে। তবে মাইগ্রামস ও এফডব্লিউসিএমএসকে একই সফটওয়্যারের দুটি নাম হিসেবে উল্লেখ করার ভিত্তি পাওয়া যায়নি; বেস্টিনেটের ওয়েবসাইটে এগুলো আলাদাভাবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। 

বিদেশি কর্মী নিয়োগে নতুন প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা নিয়ে মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যমে আলোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে। তবে বেস্টিনেটের বক্তব্য, তুরাপ বিদ্যমান সরকারি ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নয়, সেগুলোর পরিপূরক হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ব্যবস্থা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে। 

নতুন করে কর্মী পাঠানোর প্রস্তুতির মধ্যে তাই নিয়োগ ব্যয়, এজেন্সির সেবা মাশুল এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে। ফাহমিদা খাতুনের মতে, ব্যয়ের তালিকা প্রকাশের পাশাপাশি নিয়মিত তদারক ও অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।