শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর এখন সময়ের দাবি। তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন করলেই চলবে না। তথ্য অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান ও প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের দক্ষতাও অর্জন করতে হবে। অথচ বাংলাদেশের নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার বড় অংশ এখনও প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে শিক্ষার বিদ্যমান বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে প্রযুক্তি সরবরাহের পাশাপাশি শিক্ষকদের দক্ষতা, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর করতে হবে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫’ অনুযায়ী, সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭৪ দশমিক ৩৯ শতাংশে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর থাকলেও নিম্নমাধ্যমিকে এ হার মাত্র ২৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪৭ দশমিক ১৭ শতাংশে ইন্টারনেট সংযোগ নেই। অন্যদিকে দাখিল থেকে কামিল পর্যায়ের ৯ হাজার ২৯৬টি মাদ্রাসার মধ্যে ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে মাত্র ১ হাজার ১৬৫টিতে। অর্থাৎ ৮৭ শতাংশের বেশি মাদ্রাসায় এ সুবিধা নেই। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ এখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভেদে অসম।
ডিজিটাল শিক্ষা কেন প্রয়োজন তা বুঝতে বর্তমান বিশ্বের দক্ষতার চাহিদার দিকে তাকানোই যথেষ্ট। উচ্চশিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান— প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজা, তথ্যের সত্যতা যাচাই, ডিজিটাল নিরাপত্তা বোঝা এবং কম্পিউটারে কাজ করার দক্ষতা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। নিম্নমাধ্যমিক স্তরেই এসব দক্ষতার ভিত্তি গড়ে তোলা দরকার। ডিজিটাল উপকরণ দিয়ে বিজ্ঞান, গণিত ও ভাষার জটিল বিষয় সহজভাবে বোঝানো সম্ভব। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও মানসম্মত শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে। প্রযুক্তি তাই শুধু আধুনিকতার প্রতীক নয়, শেখার সুযোগ সম্প্রসারণেরও মাধ্যম।
সরকার অবশ্য এ ঘাটতি দূর করতে বড় প্রকল্পের পরিকল্পনা করছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত ১৮ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার প্রকল্পে ১০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১ লাখ শ্রেণিকক্ষে ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিজিটাল প্যানেল স্থাপন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করেছে। অন্য একটি প্রকল্পে আইসিটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ল্যাব স্থাপনের প্রস্তাব করেছে। মাদ্রাসার জন্যও পৃথক উদ্যোগের পরিকল্পনা চলছে। তবে প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ কিংবা সরঞ্জাম কেনাকাটাই শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তরের সাফল্য নয়।
ব্যানবেইসের এক গবেষণায় ৩৮৪টি স্কুল ও মাদ্রাসার ১ হাজার ৬৫৫টি আইসিটি সরঞ্জামের মধ্যে ২১৫টি অব্যবহৃত এবং ২৪৮টি নষ্ট পাওয়া যায়। অর্থাৎ সরঞ্জাম সরবরাহের পর সেগুলোর ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত না হলে সরকারি বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যায় না। অনেক শিক্ষক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না পাওয়ায় মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেন না। কোথাও আবার বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষের অভাব রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান না করে নতুন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করলে প্রত্যাশিত ফল মিলবে না।
সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত কোন প্রতিষ্ঠানে কী ঘাটতি রয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা। যেসব নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা সবচেয়ে পিছিয়ে সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন অনুযায়ী কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পৃথক বাজেট রাখতে হবে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও সরঞ্জাম সচল রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।
শিক্ষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শুধু পর্দায় স্লাইড দেখানো ডিজিটাল শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়, ছবি, মানচিত্র, গ্রাফ, ভিডিও ও ইন্টারঅ্যাকটিভ উপকরণের সাহায্যে শিক্ষার্থীর বোঝার ক্ষমতা বাড়ানোই এর লক্ষ্য। প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা কার্যকর হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফলে কী পরিবর্তন আসছে, নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে তা যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি বাংলা ভাষায় মানসম্মত ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী তৈরি এবং অনলাইন নিরাপত্তা ও ভুয়া তথ্য শনাক্ত করার শিক্ষা দিতে হবে।
প্রযুক্তি কখনও শিক্ষকের বিকল্প হতে পারে না, বরং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর যোগাযোগকে আরও কার্যকর করার মাধ্যম হওয়া উচিত। তাই ডিজিটাল শিক্ষার নামে ব্যয়বহুল সরঞ্জাম কেনার প্রতিযোগিতা নয়, প্রয়োজন শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা। শিক্ষার কোনো স্তর বা ধারার শিক্ষার্থী যেন প্রযুক্তিগত সুযোগের অভাবে পিছিয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ডিজিটাল শিক্ষায় পারদর্শী করতে পারলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিবর্তিত বিশ্বের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে।