জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: বেসামরিক চাকরির লোভনীয় প্রস্তাবে বিজনেস ভিসায় বাংলাদেশিদের নিয়ে গিয়ে জোর করে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠাচ্ছে রাশিয়া। দেশটির বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে ভিসা নিয়ে সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের বাধ্য করা হচ্ছে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে। এভাবে কেবল বাংলাদেশ নয়, আরও ২৮টি দেশ থেকে প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে তরুণ-যুবকদের পাচারের জোরালো প্রমাণ পেয়েছে ইউক্রেনবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে কমিশন বলেছে, বিভিন্ন দেশে সক্রিয় এজেন্ট ও এজেন্সির সঙ্গে যোগসাজশে এভাবে মানবপাচার করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ। চাকরির আশ্বাসে নেওয়া ব্যক্তিদের ইউক্রেনের সম্মুখসমরে মোতায়েন করে বিপজ্জনক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকে নিহত হয়েছেন কিংবা নিখোঁজ রয়েছেন।
বাংলাদেশিদের নেওয়া হয়েছে বিজনেস ভিসায়
কমিশন জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বিজনেস ভিসার অনুলিপি তাদের হাতে এসেছে। এসব ভিসায় উল্লেখ রয়েছে, রাশিয়ার একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠান তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশ থেকে কতজনকে এভাবে নেওয়া হয়েছে কিংবা তাদের কতজন নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন, প্রতিবেদনের উদ্ধৃত অংশে তা উল্লেখ করা হয়নি।
দেশ ও অঞ্চলভেদে যাত্রার জন্য ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিল নিয়োগকারী চক্র। বাংলাদেশিদের বিজনেস ভিসা দেওয়া হলেও কেনিয়ার নাগরিকদের দেওয়া হয়েছিল দুই সপ্তাহ থেকে চার মাস মেয়াদি পর্যটন ভিসা। অথচ তাদের নেওয়া হচ্ছিল কাজের কথা বলে। ডমিনিকান রিপাবলিক, কলম্বিয়া ও পেরুর নাগরিকদের তুরস্ক বা রাশিয়ায় পর্যটনের কাগজপত্র দিয়ে ভিসা ছাড়াই যাত্রা করতে বলা হয়েছিল।
চাকরির প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে রওনা হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হতো। এজেন্টরা ভিসা, বিমানের টিকিট, আবাসনসহ যাত্রার যাবতীয় ব্যবস্থা করত। অঞ্চলভেদে এজন্য ৪০০ থেকে ৮ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হতো। এই অর্থ যাত্রার আগে পরিশোধ করতে হতো অথবা পরবর্তী বেতন থেকে কেটে নেওয়ার কথা বলা হতো।
চাকরি, নাগরিকত্ব ও আবাসনের প্রলোভন
ভুক্তভোগীদের কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখে চাকরির জন্য যোগাযোগ করেছিলেন। কাউকে সরাসরি প্রস্তাব দিয়েছিল নিয়োগকারী এজেন্ট বা প্রতিষ্ঠান। তাদের নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান, নির্মাণশ্রমিক, ওয়েল্ডার ও টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন বেসামরিক পেশায় কাজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দক্ষতা অনুযায়ী তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, খেলাধুলা বা কৃষিতে কাজের প্রস্তাব দেওয়া হয়। নিজ দেশে পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে কাজ করা এক ব্যক্তি কমিশনকে জানান, রাশিয়ায় বিদেশি খেলোয়াড় নেওয়া হচ্ছে বলে তার এক সহকর্মী তাকে একজন এজেন্টের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তাকে বলা হয়েছিল, আগে রাশিয়ায় গিয়ে প্রস্তাব পছন্দ হলে তবেই চুক্তিতে সই করতে পারবেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
চাকরির সঙ্গে উচ্চ বেতন, রুশ নাগরিকত্ব, আরামদায়ক আবাসন, চাকরি শেষে পেনশনসহ নানা সুবিধার প্রতিশ্রুতি ছিল। কাউকে ভবিষ্যৎ বাসস্থানের ছবি বা ক্যাটালগও দেখানো হয়েছিল। চাকরিকে রাশিয়ায় আরও ভালো সুযোগ পাওয়ার পথ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
সাক্ষাৎকারদাতাদের বেশিরভাগ কমিশনকে জানিয়েছেন, বেসামরিক চাকরির মিথ্যা আশ্বাসে যাদের নেওয়া হয়েছিল, তাদের আগে সামরিক অভিজ্ঞতা ছিল না। কাজের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে, এমন সন্দেহেরও কারণ দেখেননি তারা। কিছু ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর জন্য কাজ করার কথা বলা হলেও আশ্বস্ত করা হয়েছিল, দায়িত্ব হবে পুরোপুরি বেসামরিক— যেমন- রান্না, গাড়ি চালানো, নির্মাণকাজ বা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন।
বিশ্বাস অর্জনে সরকারি কাগজপত্র
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের অনেকে দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছেন। কেউ বেকার ছিলেন, কেউ আর্থিক সংকটে ছিলেন। উচ্চ আয়ের আশায় তারা এসব প্রস্তাবে রাজি হন।
নিয়োগকারীদের আশ্বাস, বিদেশে কাজের আগের ভালো অভিজ্ঞতা এবং একই চাকরি করছেন বলে দাবি করা অন্যদের বক্তব্য তাদের আস্থা জুগিয়েছিল। কোনো কোনো নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সরকারি ছাড়পত্রও দেখিয়েছিল। আবার পরিচিত ব্যক্তি, এমনকি রাশিয়ায় ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকা নিজ দেশের একজন রাজনীতিকের মাধ্যমেও কেউ কেউ প্রস্তাব পেয়েছিলেন।
কিছু চাকরিপ্রার্থী রাশিয়ার বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পেয়েছিলেন। নির্দিষ্ট এজেন্সির মাধ্যমে ওই সব প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে যাওয়ার জন্য নিজ দেশের কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্রও ছিল তাদের।
কমিশন ৩০ জনের একটি দলের উদাহরণ দিয়েছে। তাদের আমন্ত্রণপত্রের সঙ্গে চাকরির নিশ্চয়তাপত্র দেওয়া হয়েছিল। তাতে আশ্বাস ছিল, তাদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হবে না কিংবা রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ইউক্রেনে অভিযানে অংশ নিতে হবে না।
অথচ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ওই দলের ১৭ জন সম্মুখসমরে নিহত হয়েছেন, পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছেন। আহত হওয়ার পর একজন দেশে ফিরতে পেরেছেন। দলটির সদস্যরা কোন দেশের নাগরিক, প্রতিবেদনের উদ্ধৃত অংশে তা উল্লেখ নেই।
পৌঁছানোর পরই চুক্তিতে সইয়ের চাপ
রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর চাকরিপ্রার্থীদের রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হয়। অনেকের ফোন ও পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। বেসামরিক চাকরির বদলে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে কাজ করতে হবে জেনে তারা হতবাক হয়ে পড়েন।
এভাবে নিয়োগ পাওয়া এক ব্যক্তির স্ত্রী কমিশনকে বলেন, ‘তারা তার পাসপোর্ট নিয়ে নেয়। এরপর শুধু বলে, চুক্তির এখানে, এখানে আর এখানে সই করো। পুরোটা রুশ ভাষায় ছিল। তাকে প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়েছিল। তার আর কোনো উপায় ছিল না।’
পরে এসব ব্যক্তিকে ইউক্রেনের সম্মুখসমরে পাঠিয়ে বিপজ্জনক দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাদের নিহত, নিখোঁজ, আহত বা বন্দি হওয়ার ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রভাব পড়েছে। স্বজনদের খুঁজে পেতে এসব পরিবারকে নিরন্তর চেষ্টা চালাতে হচ্ছে।
এজেন্টদের সঙ্গে রুশ কর্তৃপক্ষের যোগসাজশ
কমিশনের পাওয়া সাক্ষ্য ও নথি অনুযায়ী, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বিভিন্ন দেশ হয়ে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এজেন্টরা তাদের সঙ্গে যাত্রা করেছে কিংবা যাত্রাবিরতির স্থানে দেখা করেছে। বিমানবন্দরে শনাক্ত হওয়া এড়াতে কাউকে আগে সড়কপথে প্রতিবেশী দেশে গিয়ে সেখান থেকে উড়োজাহাজে উঠতে বলা হয়েছিল।
কমিশন বলেছে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় এজেন্টদের সঙ্গে রুশ কর্তৃপক্ষের উচ্চমাত্রার যোগসাজশ ছিল। এসব এজেন্ট বা এজেন্সি নিজেদের বৈধ কিংবা সরকার-অনুমোদিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিত। তারা দলবদ্ধভাবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের ভিসা ও ভ্রমণের কাগজপত্র তৈরি করত।
কয়েকটি দেশের সরকার তাদের নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে নিয়োগের বিষয়টি স্বীকার করেছে এবং নিয়োগচক্র নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। অন্যদিকে রুশ কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে অবৈধ নিয়োগের অভিযোগ প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছেন। তবে সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে কমিশন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, রুশ কর্তৃপক্ষ মানব পাচারসহ অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে।