কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে অবৈধ হোটেল-রিসোর্ট উচ্ছেদে অভিযান শুরু করেছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)। অভিযানের প্রথম দিনেই উখিয়ার ইনানী সৈকত এলাকায় প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চারতলা একটি রিসোর্ট ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। উচ্ছেদ করা হয়েছে ভবনটির নিচতলা ও দুই পাশে থাকা ১০ থেকে ১২টি দোকানঘর।
গতকাল সোমবার দুপুরে কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে ইনানী সৈকত এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়। কউকের নেতৃত্বে অভিযানে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, এসআরবি, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ইনানীতে নৌবাহিনীর জেটির পূর্ব পাশে রয়েছে তারকা হোটেল রয়েল টিউলিপ এবং উত্তরে বে ওয়াচ হোটেল। এ দুই হোটেলের মাঝামাঝি স্থানে ছিল চারতলা রিসোর্ট ভবনটি।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে ভবনটির সামনে খননযন্ত্র নিয়ে আসা হয়। খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা সেখানে ভিড় করেন। দুপুরে ভবনের নিচতলা ও দুই পাশে থাকা দোকানঘরগুলো উচ্ছেদের পর মূল ভবনের কাচ ভেঙে পিলার অপসারণের কাজ শুরু হয়।
কউকের উপপরিচালক (প্রশাসন) সানজিদা বেগম বলেন, অবৈধভাবে নির্মিত ভবনটি অপসারণ করতে মালিকপক্ষকে চারবার নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরও ভবন অপসারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
ভবনটির মালিক শহিদুল হকের দাবি, ২০১৪ সালে ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নিয়ে তিনি ভবনটির নির্মাণ শুরু করেন। প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটির নিচতলায় কয়েকটি দোকান, দ্বিতীয় তলায় রেস্তোরাঁ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় পর্যটকদের জন্য কক্ষ করা হয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যেই এটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা ছিল।
শহিদুল হক আরও বলেন, উচ্ছেদ অভিযানের আগে পাওয়া চারটি নোটিশেরই জবাব দেওয়া হয়েছে। ভবন নির্মাণের পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও রয়েছে। তবে তার অভিযোগ, এসব কাগজপত্র আমলে নেওয়া হয়নি।
গত ১৭ অক্টোবর সকালে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে তিনতলা টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লেগে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর মেরিন ড্রাইভের পাশে অনুমোদনহীন হোটেল-রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এরপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।
কউক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে প্রায় ২০০ রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এসব স্থাপনার বেশিরভাগ কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি এবং অনুমোদনহীন। অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে সম্প্রতি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের পরও স্থাপনা অপসারণ না করায় অভিযান চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০১৬ সালে কউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে কক্সবাজার পৌরসভাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণের জন্য প্রায় ১ হাজার ৭০০টি নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকলেও সেখানে ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই হাজার স্থাপনা গড়ে উঠেছে। তারকামানের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশিরভাগের অনুমোদন নেই বলে জানান তিনি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) সমুদ্রসৈকতের ৫০০ গজ এবং শহর এলাকায় পৌরসভার ৩০০ গজের মধ্যে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। এছাড়া কউকের অনুমোদন ছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন পাওয়াও সম্ভব নয়। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে যৌথ অভিযান চলছে।
যেসব প্রতিষ্ঠানের কিছু কাগজপত্র রয়েছে সেগুলোর অনুমোদনপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে ব্যবসায়ীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন এলাকায় পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় সম্প্রতি ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্তোরাঁকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের জবাব না দেওয়ায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা এবং দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
অন্যদিকে কক্সবাজার হোটেল-গেস্টহাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, এই সমিতিতে ১৮৭ সদস্য রয়েছেন। সমিতির তালিকাভুক্ত প্রায় সব হোটেল-গেস্টহাউজের অনুমোদন রয়েছে। সমিতির বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা তিনি জানেন না বলে জানিয়েছেন।