সৌদিতে জনবল সংকটে বাংলাদেশি মিশন, প্রবাসীসেবা দিতে হিমশিম

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: সৌদি আরবে বসবাস ও কর্মরত প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশির সেবা দিতে দেশটিতে বাংলাদেশের তিনটি মিশন হিমশিম খাচ্ছে। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস, জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল এবং জেদ্দায় ওআইসিতে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের কর্মকর্তারা কনস্যুলার সেবা, শ্রম ও কল্যাণ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে দায়িত্ব পালন করছেন। 

তবে মিশনগুলোর বর্তমান জনবল দিয়ে বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর সেবা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তৃতীয় বৈঠকে এই চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি। 

বৈঠকের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে বাংলাদেশের মোট তিনটি মিশন রয়েছে—রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস, জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল এবং জেদ্দায় ওআইসিতে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, শ্রম ও কল্যাণ, বাণিজ্যিক, প্রেস, ডিফেন্স, ইকোনমিক, পাসপোর্ট ও ভিসাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেখানে রাষ্ট্রদূতের তত্ত্বাবধানে ১৪ জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। 

জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল কনস্যুলার সেবা, শ্রম ও কল্যাণ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং হজ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সেখানে প্রায় ২২ জন কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। অন্যদিকে, জেদ্দায় ওআইসিতে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে স্থায়ী প্রতিনিধির অধীনে একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন।

কার্যপত্রে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭৬ সালে সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ধারাবাহিকতা থেকে দুই দেশের শ্রমবাজার সম্পর্ক গভীর হয়েছে। বর্তমানে সৌদি আরব বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শ্রমবাজার।

তবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা এবং তাদের সেবা, শ্রম ও কল্যাণসংক্রান্ত বিষয়গুলোর তুলনায় মিশনগুলোর বর্তমান কর্মকর্তা সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ফলে বিদ্যমান জনবল দিয়ে দায়িত্ব পালন মিশনগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে কার্যপত্রে। 

সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীদের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি দেশটি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে দেশে এসেছে ৫৮৪.৯১ কোটি ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের অর্থবছরের ৪২৬.৪৪ কোটি ডলারের তুলনায় ৩৭.২% বেশি। সৌদি আরব এখন বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম উৎস।
 
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে বর্তমানে আনুমানিক ৩৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করছেন। ২০২৫ সালে দেশটিতে ৭,৫২,৭১৫ বাংলাদেশি কর্মী গেছেন, যা একক কোনো দেশে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর সর্বোচ্চ। 

বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরব শুধু বড় শ্রমবাজার নয়, রেমিট্যান্সেরও সবচেয়ে বড় উৎস। ফলে দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট, ভিসা, শ্রম অধিকার, কল্যাণ ও অন্যান্য কনস্যুলার সেবা নিশ্চিত করতে দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।

স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহের কার্যক্রম ও জনবল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিটির কাছে বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা, মিশনগুলোর প্রধান কার্যক্রম, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স, শ্রমবাজারের প্রধান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা, রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের শ্রমকল্যাণ সেবা এবং হজ কার্যক্রম বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে। 

এছাড়াও বৈঠকে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কমিটি মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে।

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের দুর্বলতা ছিল কি না, প্রশ্ন কমিটির
মক্কায় গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। 

এ ঘটনায় জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কোনো দুর্বলতা ছিল কি না, তা জানতে চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এ ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা থাকলে সে বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তাও কমিটিকে জানাতে বলা হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের ১৮ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠি অনুযায়ী, নজরুল ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সাইবার অপরাধের অভিযোগে এবং সুইটি পরদিন ব্যভিচারের অভিযোগে আটক হন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো বন্দিদের তালিকায় তাদের নাম থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের তথ্য ছিল না। 

ওই চিঠিতে সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের কারাগারগুলোতে ৩০৬ বাংলাদেশি বন্দি থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৪৭ জনের এক মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হয়েছে। 

কনস্যুলেট জানিয়েছে, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড বা তা কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে থেকে তাদের অবহিত করেনি। এ ঘটনায় বাংলাদেশ সৌদি সরকারের কাছে বিচারিক রায়, অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।

আজকের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেটের কার্যক্রম পর্যালোচনার পাশাপাশি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা মোকাবিলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কৌশল নিয়েও আলোচনা হয়েছে। 

কার্যপত্র অনুযায়ী, ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান, তার দেশে প্রত্যাবর্তন এবং ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ সম্পর্কে কমিটিকে অবহিত করার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংসদীয় ইউনিয়নের (আইপিইউ) নির্বাহী কমিটির এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের সদস্য পদে নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতার বিষয়টিও সভায় আলোচনা হয়।

সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে কমিটির সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন, এমপি; এস কে আজিজুল বারী, এমপি; সাঈদ আল নোমান, এমপি; হুমাম কাদের চৌধুরী, এমপি এবং সানজিদা ইসলাম, এমপি অংশগ্রহণ করেন। কমিটির বিশেষ আমন্ত্রণে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।

—জা.অর্থনীতি/আরএস