আল-জাজিরা, তুলকারেম (অধিকৃত পশ্চিম তীর): দুর্বিষহ জীবনযাপনের কথা বলতে গিয়ে কান্না ধরে রাখতে পারেননি ৭৫ বছর বয়সি বিধবা ফাওজা আওয়াদ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে উত্তর-পশ্চিম তীরের শরণার্থী শিবিরগুলোয় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ফলে তুলকারেম শরণার্থী শিবির থেকে বাস্তুচ্যুত হন তিনি। ওই অভিযানে কয়েক হাজার ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়।
অর্থের অভাবে ফাওজা ও তার পরিবার আশ্রয়ের জন্য যেখানে পেরেছেন সেখানেই ঠাঁই খুঁজেছেন। শেষ পর্যন্ত তারা তুলকারেমে তার মেয়ের মালিকানাধীন একটি ছোট, অসমাপ্ত বাড়িতে আশ্রয় নেন। বর্তমানে তিনি বাড়িটির একটি অংশে তার ছেলে, ছেলের স্ত্রী এবং নাতি-নাতনির সঙ্গে বসবাস করছেন।
পরিবারটি আগে বিশ্বখাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) কাছ থেকে সীমিত আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা পেত। কিন্তু গত পাঁচ মাস ধরে তারা কোনো সহায়তা পায়নি।
জাতিসংঘের এই সংস্থা সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে খাদ্য সহায়তা পাওয়া মানুষের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমানো হবে। আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছ থেকে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় ‘তীব্র অর্থসংকট’- সৃষ্টির কথা উল্লেখ করে সংস্থাটি এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
ডব্লিউএফপি এমন সময় পশ্চিম তীরে খাদ্য সহায়তা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে যখন কী না ২০২৩ সালের তুলনায় খাদ্যের চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে সেখানে। ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। সে সময় ডব্লিউএফপি জানিয়েছিল, পশ্চিম তীরে প্রায় ৯ লাখ মানুষ বর্তমানে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ডব্লিউএফপি নিশ্চিত করেছে যে সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার আগেই কিছু পরিবার খাদ্য সহায়তা পাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।
ফাওজা ও তার পরিবার এখন নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। তাদের পুরোনো বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। ফাওজার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাদের বাড়িটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং সেখানে একটি প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করেছে, যাতে সামরিক যানবাহন সহজে চলাচল করতে পারে।
তিনি আরও জানান, তার এক ছেলেকে ২০২৪ সাল থেকে ইসরায়েল আটক করে রেখেছে। অন্য ছেলেরা আগে ইসরায়েলের ভেতরে কাজ করতেন কিন্তু এখন তারা সবাই বেকার।
ফাওজা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমি হাঁপানি ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছি। প্রতি মাসে ওষুধ কিনতে অন্তত ২০০ শেকেল (৬৪ ডলার) খরচ হয় কিন্তু এই খরচ বহন করার মতো কেউ নেই। আগে আমরা সামান্য খাদ্য সহায়তা পেতাম যা দুই-তিনজনের বেশি মানুষের জন্য যথেষ্ট ছিল না। এখন সেই সহায়তাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।’
‘এমনকি রুটিও জোটে না’
তুলকারেমের থান্নাবেহ উপশহরে অবস্থিত আল-মুওয়াহহিদ স্কুল ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন তুলকারেম ও নুর শামস শরণার্থী শিবির থেকে বাস্তুচ্যুত এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি। তাদের যাওয়ার মতো অন্য কোনো জায়গা নেই এবং বাড়িভাড়া দেওয়ার সামর্থ্যও নেই।
তাদের মধ্যে রয়েছেন ৪৭ বছর বয়সি রাবাব কাসিম, তার ৭২ বছর বয়সি স্বামী তালিব আবু সাররিয়া এবং তাদের তিন সন্তান। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো তারা স্কুলটির নিচতলায় মাত্র ৩০ বর্গমিটার (৩২০ বর্গফুট) আয়তনের একটি ছোট কক্ষে বসবাস করছেন। তাদের কোনো আয়ের উৎস নেই এবং তারা সম্পূর্ণভাবে সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
ডব্লিউএফপির খাদ্য সহায়তা কমানোর পর গত তিন মাস ধরে পরিবারটি কোনো ধরনের সহায়তা পায়নি।
রাবাব বলেন, ‘আমার মেরুদণ্ডের ডিস্ক সরে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে। প্রতি মাসে চিকিৎসার জন্য ৩০০ শেকেল (৯৬ ডলার) খরচ হয় যা আমার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। আমার ফিজিওথেরাপিও প্রয়োজন কিন্তু অর্থের অভাবে কখনওই তা করাতে পারিনি। আমি মেঝেতে একটি জীর্ণ গদির ওপর ঘুমাই। আমার শুধু একটাই ইচ্ছা—একটি বিছানা কেনার সামর্থ্য যেন হয়।’
তালিব আল-জাজিরাকে জানান, তাদের পরিবার প্রায়ই রুটি কিংবা একবেলার খাবারও জোগাড় করতে পারে না। অনেক সময় ক্ষুধার্ত অবস্থায় তাদের ঘুমাতে যেতে হয়।
শরণার্থী শিবিরে তাদের আগের জীবনের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কোনো তুলনাই হয় না। একসময় তুলকারেম শরণার্থী শিবিরে তার একটি ছোট সবজির দোকান ছিল। আয় খুব বেশি না হলেও তা দিয়ে পরিবারের মোটামুটি চলত।
লড়াইয়ে একা
ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান হামলা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির কারণে মানুষের জীবিকা ধ্বংস হচ্ছে, ক্ষুধা বাড়ছে এবং পরিবারগুলো আরও গভীর সংকটের মুখে পড়ছে।
ডব্লিউএফপির সর্বশেষ ত্রৈমাসিক খাদ্যনিরাপত্তা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের ৭৬ শতাংশ ফিলিস্তিনি পরিবার তাদের আয়ের উল্লেখযোগ্য পতনের সম্মুখীন হয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, জনসংখ্যার ১২ শতাংশের খাদ্য গ্রহণের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। দ্রুত অবনতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এক-তৃতীয়াংশ পরিবার স্বাস্থ্যকর খাদ্য কিনতে পারছে না। গ্রামীণ অঞ্চল এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলীয় গভর্নরেটগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হেবরনের দক্ষিণে মাসাফের ইয়াত্তার খিরবেত আল-রাকিজ গ্রামের ৬১ বছর বয়সি বাসিন্দা সাঈদ আল-আমুর আল-জাজিরাকে জানান, তিনি ও তার ১৪ সদস্যের পরিবার গত সাত মাস ধরে ডব্লিউএফপির কাছ থেকে কোনো সহায়তা পাননি।
২০২৫ সালের এপ্রিলে গ্রামটিতে বসতি স্থাপনকারীদের বারবার হামলার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করার সময় সাঈদের দাবি অনুযায়ী, একজন বসতি স্থাপনকারী তাকে গুলি করেন। এতে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয় এবং তিনি স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। বসতি স্থাপনকারীদের মুখোমুখি হলেই তিনি এখনও মাঝেমধ্যে হামলা ও মারধরের শিকার হন। পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতার এটি একটি অংশ।
সাঈদ বলেন, ‘তারা আমাদের জমি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমি তাদের জমি নিতে দেব না। আমি জমি রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাব কিন্তু এর জন্য আমাকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। এখন তারা আমার সেই সহায়তাও বন্ধ করে দিয়েছে যা পেয়ে আমি আমার পরিবারকে এখানে টিকে থাকতে সাহায্য করতাম।’
পা হারানোর কারণে আল-আমুরের প্রতি মাসে চিকিৎসার জন্য অন্তত ১ হাজার ২০০ শেকেল (৩৮৫ ডলার) প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই ব্যয় বহন করার সামর্থ্য তার নেই। কয়েকটি জলপাইগাছ ছাড়া তার আয়ের আর কোনো উৎস নেই। বসতি স্থাপনকারীরা প্রায়ই সেই গাছগুলো দখলে নেওয়ার চেষ্টা করে।
জীবিকার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে
সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করে ডব্লিউএফপি এখনও পশ্চিম তীরের ২ লাখ ফিলিস্তিনিকে সহায়তা দিচ্ছে। এই সহায়তার মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ প্রদান, খাদ্য ভাউচার, সরাসরি খাদ্য বিতরণ, জীবিকা সহায়তা কর্মসূচি এবং পুষ্টিসেবা।
তবে ডব্লিউএফপি আল-জাজিরাকে জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে যেসব পরিবারের সহায়তা প্রয়োজন তাদের সবার চাহিদা পূরণ করার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ সংস্থাটির হাতে নেই।
ডব্লিউএফপি বলেছে, ‘সহায়তা বন্ধ হওয়ার অর্থ এই নয় যে কোনো সুবিধাভোগী ব্যক্তি সহায়তা পাওয়ার অযোগ্য। বরং এটি এমন একটি ব্যাপক সিদ্ধান্ত যা ব্যক্তিগত মূল্যায়নের ফলাফল নির্বিশেষে বর্তমানে সহায়তা পাওয়া সব সুবিধাভোগীকে প্রভাবিত করছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে এবং কিছু সুবিধাভোগীর জন্য সহায়তা পুনরায় চালু করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে খুদে বার্তার মাধ্যমে জানানো হবে।’
অর্থনীতিবিদ ও মানবাধিকারকর্মী উবাই আবুদি আল-জাজিরাকে বলেন, ডব্লিউএফপির খাদ্যসহায়তা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) আর্থিক সংকট পশ্চিম তীরের মানবিক পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।