হারুনুর রশিদ, ঢাকা: পুরান ঢাকার পগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রায় ১ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন ৪৪ জন। সে হিসাবে প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী প্রায় ৩৬ জন। বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকসংকট থাকায় কর্মরত শিক্ষকদের বাড়তি ক্লাস নিতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত প্রধান শিক্ষকও নেই; ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে কার্যক্রম।
একই এলাকার সদরঘাটে অবস্থিত ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের চিত্র আরও খারাপ। প্রভাতি ও দিবা- দুই পালায় পরিচালিত বিদ্যালয়টিতে প্রায় ১ হাজার ৯৮০ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক রয়েছেন ৩৫ জন। মোট শাখা ৩৪টি। এখানে প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী প্রায় ৫৭ জন।
বিদ্যালয়টির এক সহকারী শিক্ষক জানান, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় কোনো রকমে পাঠদান চলছে। সবসময় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে ক্লাসের রুটিন তৈরি, পাঠদান ও পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে। অনেককে সপ্তাহে ২৫ থেকে ৩০টি ক্লাস নিতে হচ্ছে।
পগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক রেজাউল করিম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, তাদের বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকসংকট রয়েছে। বাড়তি ক্লাস সামলাতে গিয়ে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে মানসম্পন্ন পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য অনুযায়ী, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের প্রায় ৩৮ শতাংশ পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদেও বড় ঘাটতি রয়েছে। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব ও কর্মরত শিক্ষকদের বাড়তি চাপের মধ্যে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন, শিক্ষক নিয়োগে সরকারের সুপরিকল্পিত জনবল পরিকল্পনা থাকতে হবে। কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষক প্রয়োজন, কতজন অবসরে যাবেন এবং শূন্যপদ কীভাবে পূরণ করা হবে—এসব বিষয়ে কার্যকর পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে অনেক পদ শূন্য থাকলেও নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। অথচ শিক্ষক নিয়োগ না করেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে চাইছে সরকার।
সহকারী শিক্ষকের ৬ হাজারের বেশি পদ শূন্য
মাউশির চলতি বছরের ২৫ মার্চের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের মোট পদ ১৬ হাজার ১৪১টি। এর মধ্যে পুরোনো সরকারি বিদ্যালয়ে ১০ হাজার ৮৮৪টি এবং আত্তীকৃত বিদ্যালয়ে ৫ হাজার ২৫৭টি পদ রয়েছে।
মোট পদের বিপরীতে কর্মরত শিক্ষক রয়েছেন ১০ হাজার ৯৩ জন। শূন্য রয়েছে ৬ হাজার ৪৮টি পদ যা মোট পদের প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের ৫৭২টি পদের মধ্যে ৩৭৯টি শূন্য। অর্থাৎ শূন্য রয়েছে প্রায় ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ পদ। সহকারী প্রধান শিক্ষকের ৭০২টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৭৫ জন। বাকি ৫২৭টি বা প্রায় ৭৫ দশমিক ১ শতাংশ পদ শূন্য।
মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, শিক্ষকসংকটে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগায় শিক্ষক নিয়োগ কার্যত ঝিমিয়ে পড়েছে। বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও তুলে ধরা হয়েছে। এখনও সমাধান হয়নি। তবে দ্রুত সমাধানের আশা করছেন তারা।
অধ্যাপক মনিনুর রশিদ বলেন, সরকার ভালো শিক্ষক চায় কিন্তু ভালো শিক্ষক আকৃষ্ট করার মতো বেতনকাঠামো নেই। আবার শিক্ষক নিয়োগ দিলে ব্যয় বাড়বে—এমন বিবেচনাও কাজ করে। ফলে সংকট থেকেই যাচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষার মান উন্নয়ন কঠিন।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে বহু বিদ্যালয়
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫’ অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরের ২০ হাজার ৭৬৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩ হাজার ৫৯৩টিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। এ সংখ্যা মোট বিদ্যালয়ের ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। আরও ১ হাজার ৮২৮টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ব্যানবেইসের হিসাবে, ৬৩৪টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩০২টিতে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক রয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে ২৭১টি বা ৪২ দশমিক ৭৪ শতাংশ বিদ্যালয়।
বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও একই সমস্যা রয়েছে। ১৬ হাজার ১০৩টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৬৪৯টিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। এ হার ১৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এ ছাড়া ২ হাজার ৪৭৪টি বেসরকারি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৯৪টি বা ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে।
ব্যানবেইসের ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান ও মাউশির চলতি বছরের মার্চের হিসাবে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। দুটি উৎসের তথ্য সরাসরি তুলনার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতে বড় ব্যবধান
ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ১৯ হাজার ২১১টি সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৭৪ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯ জন। শিক্ষক ছিলেন ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৩১ জন। সে হিসাবে প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে গড়ে প্রায় ২৮ জন শিক্ষার্থী ছিল।
অন্যদিকে একই বছর ১৪৩টি ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ে শিক্ষক ছিলেন ৭ হাজার ৬৯৭ জন। শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ২৯ হাজার ৭০০ জন। এই হিসাবে প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী প্রায় ৪ জন।
ইংরেজি ও গণিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার ঘাটতি
ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি পড়ান এমন ৯ হাজার ৯৮২ জন শিক্ষক স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করেননি। একইভাবে গণিত পড়ান এমন ১০ হাজার ১৬৯ জন শিক্ষক স্নাতক পর্যায়ে গণিত বিষয়ে পড়েননি।
এই তথ্য বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাগত পটভূমির ঘাটতি তুলে ধরে। তবে শুধু এ কারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পাঠদানের যোগ্যতা নেই—এমন সিদ্ধান্তে আসা যায় না। প্রতিবেদনভিত্তিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের বিএড, এমএড বা বিপিএডের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণও নেই।
অধ্যাপক মনিনুর রশিদ বলেন, কোন বিদ্যালয়ে কতজন শিক্ষক প্রয়োজন, কতজন কর্মরত আছেন, কোন বিষয়ে শিক্ষক নেই এবং কাউকে নিজের বিষয়ের বাইরে অন্য বিষয় পড়াতে হচ্ছে কি না—এসব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সঠিক শিক্ষককে সঠিক বিষয়ে পাঠদানের দায়িত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি ভালো কর্মপরিবেশ, উপযুক্ত বেতনকাঠামো ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু বক্তব্য দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়; বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
সাধারণ মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখের বেশি
শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমার চিত্রও উঠে এসেছে ব্যানবেইসের পরিসংখ্যানে। ২০২৪ সালে এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন। ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে ৭৪ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯ জন।
এক বছরে শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৫০৭ জন বা প্রায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৯ হাজার ১১৭টি থেকে বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার ২১১টি। অর্থাৎ বিদ্যালয় ৯৪টি বাড়লেও শিক্ষার্থী কমেছে।
অন্যদিকে দাখিল থেকে কামিল পর্যায়ের মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে। এসব মাদ্রাসার সংখ্যা ২০২৪ সালের ৯ হাজার ২৬৯টি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে হয়েছে ৯ হাজার ২৯৬টি।
একই সময়ে শিক্ষার্থী প্রায় ২৭ লাখ ৯৬ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ২৮ লাখ ৪০ হাজার হয়েছে। ব্যানবেইসের হিসাবে, এক বছরে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি।
ইংরেজি মাধ্যমেও শিক্ষার্থী বেড়েছে। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২৯ হাজার ৭৭ জন। পরের বছর তা বেড়ে প্রায় ২৯ হাজার ৭০০ হয়েছে।
তবে সাধারণ মাধ্যমিক, দাখিল থেকে কামিল এবং ইংরেজি মাধ্যমের এসব পরিসংখ্যানের শিক্ষাস্তর এক নয়। ফলে এগুলো দিয়ে শিক্ষার্থীদের এক ধারা থেকে অন্য ধারায় চলে যাওয়ার সরাসরি সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
অধ্যাপক মনিনুর রশিদের মতে, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমছে। শিক্ষাক্রমে বারবার পরিবর্তন আনা হলেও তা অনেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না। তাদের অনেকে মনে করেন, বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর পরও মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রাইভেট পড়ার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে ব্যয় ও অসন্তোষ—দুটিই বাড়ছে।
তিনি বলেন, একশ্রেণির অভিভাবক বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগের প্রত্যাশায় সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে আগ্রহী হচ্ছেন। অন্যদিকে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের মধ্যে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকের জন্য সাধারণ শিক্ষার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে। তার মতে, ব্যয়, শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ এবং ধর্মীয় বিবেচনায় কেউ কেউ মাদ্রাসা শিক্ষার দিকে ঝুঁকছেন।