প্রশ্নফাঁস, বেকার যুবকের আর্তনাদ শুনবে কে

মো. আরিফ উল্লাহ: দীর্ঘ সময় লেখাপড়া করে একটি চাকরির আশায় ছুটে চলা বেকার যুবকের ভেতরের আর্তনাদ কতটা গভীর, তা সে ছাড়া অন্য কেউ অনুভব করতে পারবে না। শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা আশায় বুক বাঁধেন, তাদের সন্তান এবার একটি ভালো চাকরি করবে, সংসারের হাল ধরবে। অন্যদিকে সরকারি চাকরি না পেলে প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের কেউ কেউ অপমান করতেও দ্বিধা করেন না। এমন পরিস্থিতিতে একজন বেকার যুবক কতটা মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যায়, তা পরিমাপ করা গেলে হয়তো তার কষ্টের গভীরতা কিছুটা বোঝা যেত।

এমনিতেই দেশে শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তার ওপর সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ চাকরিপ্রার্থীদের হতাশা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বছরের পর বছর পড়াশোনা, কোচিং, বই কেনা, যাতায়াত ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অর্থ ব্যয় করার পর একজন প্রার্থী যখন জানতে পারেন, পরীক্ষার প্রশ্ন আগেই ফাঁস হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তখন তার মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—তার এত দিনের পরিশ্রমের মূল্য কোথায়?

আমরা যদি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর দিকে লক্ষ করি তাহলে দেখা যাবে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৬ লাখ ২০ হাজার। বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সরকারি চাকরির দিকে তরুণদের এমন আগ্রহের পেছনে বিশেষ কিছু কারণ রয়েছে, যার মধ্যে স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তা, চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার স্বপ্ন। তাই নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠলে তাদের হতাশ হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রশ্নফাঁসের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়, আমরা এমনও দেখেছি যে পরীক্ষার শুরু হওয়ার আগে প্রশ্নফাঁসের গুঞ্জন ছিল কিন্তু পরীক্ষা হয়ে গেছে এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ থাকার পরেও নিয়োগ প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়েছে। বেশিদিন আগের ঘটনা নয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে সারা দেশে আলোচনা হয়। সেই বছরেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের তৃতীয় ধাপেও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। যা আদালত পর্যন্ত গড়ায়, হাইকোর্ট ঢাকা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের নিয়োগ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে দেন।

কিছুদিন আগে চলতি বছরের ১০ অক্টোবর সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের ভিত্তিতে, পরীক্ষা শুরুর এক দিন আগে পরীক্ষাটি স্থগিত করা হয়। অধিকাংশ পরীক্ষার্থী ইতোমধ্যে ঢাকা শহরে পৌঁছে গিয়েছিল। মোট ২৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন জমা দিয়েছিল প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। এ ধরনের ঘটনা নিয়োগ পরীক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। যাদের লোভের কারণে হাজারো শিক্ষার্থীর শ্রম ও অর্থ এবং স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা কমে যাওয়া। একজন প্রার্থী যখন এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় যে, মেধা ও পরিশ্রমের চেয়ে প্রশ্ন পাওয়ার মাধ্যমে দ্রুত সাফল্য পাওয়া যায়, আর এভাবে অবিশ্বাস বাড়তে থাকলে যোগ্য তরুণরা হতাশ হয়ে পড়তে পারে।

প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে সবার আগে প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, প্রশ্নপত্র তৈরি, ছাপানো, সংরক্ষণ ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কার্যক্রমের রেকর্ড রাখতে হবে। তদন্ত কমিটি গঠন করার বিষয়টি যেমন হাইলাইট করা হয় তেমনি তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফলও জনসমক্ষে প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে, কেন্দ্রীয় অভিযোগ জানানোর জন্য শক্তিশালী সফটওয়্যার ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ দেওয়া যাবে। বেসরকারি খাতে মানসম্মত কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতেও সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। এতে তরুণদের সামনে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। বেকার তরুণের চাকরি পাওয়ার সঙ্গে তার পরিবারের স্বপ্নও জড়িয়ে থাকে। এখানে কেউ করুণা চান না, চান তার ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ। তারা চান, চাকরি পাক মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে।

পাশাপাশি জনশক্তি রপ্তানির জন্য কাজ করতে হবে, বেকার সমস্যাকে সুযোগে পরিণত করতে হবে, দেশের মেধাকে যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের জন্য প্রচলিত আইন সংশোধন করে আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। চাকরিপ্রার্থীর আর্তনাদ যেন আর অবহেলিত না হয়, তাদের স্বপ্ন যেন অনিয়মের কাছে হেরে না যায়।

প্রতিষ্ঠাতা, কোস্টাল কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার