হরমুজে ইরানের হামলায় জাহাজডুবি: ভেসে আসা পণ্যের খোঁজে স্থানীয়রা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান সোমবার (১৯ অক্টোবর) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ১০ দিনে এই প্রণালি অতিক্রমকারী অন্তত ১৫টি কনটেইনারবাহী জাহাজে আক্রমণ চালানো হয়েছে। এর জেরে সাগরে ভেসে থাকা কনটেইনারগুলোতে দামি ইলেকট্রনিক সামগ্রী রয়েছে বলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও গুজবের ওপর ভিত্তি করে উপকূলে সুযোগসন্ধানীদের তৎপরতা বেড়েছে। চলমান এই হামলার মাধ্যমে হরমুজে তেহরান নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যার সরাসরি প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১০৮ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

গত বুধবার পাকিস্তানের করাচি থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহগামী একটি পণ্যবাহী জাহাজ সাগরে মাইন বিস্ফোরণের শিকার হয়ে ডুবে যায়। জাহাজে থাকা ২১ জন নাবিক অক্ষত অবস্থায় নিরাপদে উদ্ধার হলেও এর আড়াই হাজার কনটেইনারের মধ্যে কয়েক ডজন সাগরের পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে কনটেইনারে আইফোনসহ দামি সামগ্রী থাকার জল্পনা নাকচ করে দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ইরানের সাইবার পুলিশের কর্মকর্তা জাভাদ মোখতার রেজাই সতর্ক করেছেন যে লবণাক্ত পানি ও আর্দ্রতায় যেকোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রের সার্কিট ও ডিসপ্লে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া দেশটির মোবাইল ফোন অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র মেইসাম দোস্ত-মোহাম্মাদি জানান, সাধারণ বাণিজ্যিক কনটেইনারে এভাবে মূল্যবান ডিভাইস পরিবহন করা হয় না। এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, অনুমতি ছাড়া কিংবা শনাক্তকরণ যন্ত্র (ট্রান্সপন্ডার) বন্ধ রেখে চলাচলকারী জাহাজে আঘাত হানার অধিকার তাদের রয়েছে এবং সমুদ্রে ভেসে আসা কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ যাতে স্থানীয়রা লুট না করেন, সে বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

সামরিক এই সংঘাতের তীব্রতা কেবল কনটেইনার জাহাজেই সীমাবদ্ধ নেই; জ্বালানিবাহী ট্যাংকারগুলোও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, গত শনিবার দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়, যার একটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল। পরবর্তীতে রোববার রাতে আরও একটি ট্যাংকার আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ২৫৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে, যা সংঘাত শুরুর আগের স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম। এই বিপুল বাণিজ্য হ্রাসের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

সামরিক হামলার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে। ভারতের চেন্নাইয়ের আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দেবরাজ আসির রমেশ সতর্ক করেছেন যে সাগরে তেল ছড়িয়ে পড়া, বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যের বিস্তার এবং পানির নিচে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর অপূরণীয় ক্ষতি করছে, যার ফলে বিশেষ করে ডলফিন ও শুশুকের মতো সংবেদনশীল জলজ প্রাণীদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিকে গত শুক্রবার পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড বা ‘ইকোসাইড’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং বিষয়টি নিরসনে আন্তর্জাতিক মহলের জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে চলমান সংকট নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ তেহরান সফর করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন। তেহরান জানিয়েছে, তাদের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে তারা ছয় দিনের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি দিয়ে সব জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে সংঘাতপীড়িত এই অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রোববার প্রতিরোধমূলক ও আগাম সামরিক আক্রমণ পরিচালনার ওপর জোর দিয়ে নতুন জাতীয় নিরাপত্তা নীতি ঘোষণা করেছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধের ঝুঁকিকে আরও উসকে দিয়েছে।
জেএ/অভি