জাতীয় অর্থনীতি আন্তর্জাতিক: ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ চলছে। ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং বিরোধীদের আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী দল ও সমালোচকদের অভিযোগ, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে ভারতের গণতন্ত্র ও সংবিধান হুমকির মুখে পড়ছে। তবে বিজেপি সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ভারতের কৌতুকশিল্পী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কুনাল কামরার একটি সাম্প্রতিক পডকাস্টে বিজেপিকে নিয়ে আলোচনার পর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। সেখানে বিজেপিকে শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং ভারতের জন্যই হুমকি হিসেবে দেখার বক্তব্য উঠে আসে।
গত ১৪ অক্টোবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু প্রকাশিত এক ভিডিও প্রতিবেদনে বামপন্থি ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরার বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তিনি বিজেপিকে ভারতের গণতন্ত্র ও সংবিধানের শত্রু বলে মন্তব্য করেন।
নেহার অভিযোগ, বিজেপি সরকার গণতন্ত্র ও সংবিধানের মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করছে। ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করা মানে দেশের গণতন্ত্রের ওপর আঘাত। যারা গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার জন্য লড়াই করেছেন, তারা এমন পরিস্থিতি মেনে নেবেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে ১৩ অক্টোবর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, বিরোধীদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার। তাঁর অভিযোগ, দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ও সংবিধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিক্ষোভে বাধা ও সাংবাদিকদের হয়রানির অভিযোগ
বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধীদের কণ্ঠরোধের অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের পর এ নিয়ে আলোচনা বেড়েছে।
১৪ অক্টোবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সংবাদ প্রতিদিন জানায়, দিল্লিতে বিক্ষোভ আয়োজনের ক্ষেত্রে নতুন আর্থিক ব্যয় ও অনুমতির বাধা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার হলেও রাজধানীতে তা পালন করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে সমালোচকদের দাবি।
এর আগে ১৩ অক্টোবর বিবিসির এক প্রতিবেদনে দিল্লিতে বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের বাধা, আটক ও হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরা হয়। পুলিশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলেও এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বিজেপির জন্ম ও রাজনৈতিক উত্থান
বিজেপির বর্তমান রাজনীতি বুঝতে হলে দলটির ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা অনুযায়ী, বিজেপি স্বাধীনতাপরবর্তী ভারতের একটি হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল। উত্তর ভারতে এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে দলটির ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে। পরে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মানুষের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করে দলটি।
বিজেপির শিকড় ভারতীয় জন সংঘের (বিজেএস) সঙ্গে যুক্ত। ১৯৫১ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) রাজনৈতিক শাখা হিসেবে জন সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৭ সালে জন সংঘসহ কয়েকটি দল মিলে জনতা পার্টি গঠন করে এবং কংগ্রেসের বাইরে প্রথম সরকার প্রতিষ্ঠা করে। অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে ১৯৭৯ সালে সেই সরকারের পতন হয়।
এরপর ১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি গঠিত হয়। অটল বিহারি বাজপেয়ি, লালকৃষ্ণ আদভানি ও মুরলি মনোহর যোশি দলটির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বিজেপি হিন্দুত্বকে দলীয় আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে। দলটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির অন্যতম প্রধান দল কংগ্রেসের নীতির সমালোচনা করে আসছে। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থানে রামমন্দির নির্মাণের দাবিও বিজেপির রাজনৈতিক উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনায় বিজেপি-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। ঘটনাটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।
১৯৯৬ সালে বিজেপি লোকসভায় একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসে। ১৯৯৮ সালে শরিকদের নিয়ে সরকার গঠন করেন অটল বিহারি বাজপেয়ি। ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) জয়ী হলে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর সরকারের সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভারতের অগ্রগতি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ আলোচনায় আসে। তবে ২০০৪ ও ২০০৯ সালের নির্বাচনে বিজেপি কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে পরাজিত হয়।
নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপির বিস্তার
গুজরাটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি জাতীয় রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। মোদি উন্নয়ন ও ‘নতুন ভারত’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালান। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে মুসলিমবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়। তবে নোট বাতিল, করনীতি, বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সরকার সমালোচনার মুখে পড়ে। এরপরও ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপি আবারও বড় জয় পায়।
দ্বিতীয় মেয়াদে মোদি সরকার জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে। এ সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক বিতর্ক হয়। করোনা মহামারির সময়ও সরকারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা দেখা দেয়।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও এনডিএ জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এর মধ্য দিয়ে মোদি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক
বিজেপির বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ১৩ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে বিহারের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন বিশেষভাবে ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। এ প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ন তোলে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতিতে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগও তোলে তারা। সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সমালোচকদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হওয়ায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত হয়েছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ উঠেছে। রাহুল গান্ধীও ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের অবস্থান ভিন্ন।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সংশোধনের পর বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও ভোটার তালিকা সংশোধনের দাবিতে দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ চলছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে কমিশনকে প্রভাবিত করার অভিযোগও তুলছেন তাঁরা।
গত ১০ অক্টোবর ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দেয়। এরপর বিক্ষোভকারীদের আটক, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি এবং আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপের অভিযোগ সামনে আসে।
এআইএসএর সভাপতি নেহা বোরাও একাধিকবার আটক হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আটক অবস্থায় পুলিশের গাড়ির ভেতরের পরিবেশ নিয়ে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, গাড়িতে ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করে তালাবদ্ধ রাখা হয়েছিল এবং সেখানে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াও কঠিন ছিল।
১৩ অক্টোবর এবিপি আনন্দের একটি ভিডিও প্রতিবেদনে বিক্ষোভকারীদের আটক ও পুলিশের আচরণ নিয়ে অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সেখানে কয়েকজন আন্দোলনকারীকে পুলিশের মারধর ও হয়রানির অভিযোগ করতে দেখা যায়। তবে ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে স্বাধীন তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
১৪ অক্টোবর মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসি এক প্রতিবেদনে মোদি সরকারের আন্দোলন দমনের কৌশল নিয়ে সমালোচনা করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কঠোর পদক্ষেপ আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ বাড়াতে এবং ভোটার তালিকা নিয়ে প্রতিবাদ আরও ছড়িয়ে দিতে পারে।
রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ভবিষ্যৎ প্রশ্ন
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়ছে। হিন্দুস্তান টাইমস-এর ১২ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে আইনজীবী ও সমাজকর্মী প্রশান্ত ভূষণের একটি কথিত অডিও রেকর্ড নিয়ে বিতর্কের কথা বলা হয়। ওই অডিওতে ‘বিপ্লব’-এর কথা রয়েছে বলে দাবি করা হলেও সংবাদমাধ্যমটি রেকর্ডটির সত্যতা ও সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। বিজেপি এ বক্তব্যকে সরকারকে অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছে।
বিজেপির সঙ্গে আরএসএসের ঐতিহাসিক সম্পর্কও দলটিকে ঘিরে বিতর্কের একটি বড় বিষয়। আরএসএস ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির বিরুদ্ধে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী হত্যার পর সংগঠনটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পরে সংবিধান ও জাতীয় পতাকা মেনে নেওয়ার শর্তে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
সমালোচকদের মতে, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করছে। অন্যদিকে বিজেপি উন্নয়ন, জাতীয় ঐক্য ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের কথা বলে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে।
সব মিলিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং বিক্ষোভকারীদের প্রতি পুলিশের আচরণ নিয়ে ভারতে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা এবং নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করা—ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে চলমান আলোচনায় এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
—জা.অর্থনীতি/আরএস