বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে আমাদের  কতটা উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?

ডাম্বিসা মোয়ো: অর্থনীতি, আর্থিক বাজার, রাজনীতি ও সমাজ— সবকিছু একই সময়ে এতটা অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে এমন সময়ের কথা মনে করা কঠিন। শুধু তাই নয়, বর্তমানে এসব ক্ষেত্রে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মাত্রাও নজিরবিহীন। বিশ্ব অর্থনীতি এখন ধীরগতির প্রবৃদ্ধির একটি চক্রে আটকে আছে। অনেক দেশেই, বিশেষ করে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধির হার ৩ শতাংশের অনেক নিচে থমকে আছে। অথচ এক প্রজন্মের ব্যবধানে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করতে হলে এই মাত্রার প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে কেন্দ্র করে নতুন প্রযুক্তিগত বিপ্লব এই প্রবণতা কিছুটা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০৩২ সালের মধ্যে এআই খাতে বার্ষিক বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তি গুরুতর এমনকি মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ ঝুঁকিও তৈরি করছে। অ্যানথ্রোপিকের দারিও আমোদেই ও ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যানের মতো প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরাও সম্প্রতি বলেছেন, নিজেদের তৈরি এআই মডেলগুলোকে নির্ভরযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অত্যাধুনিক এআইয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম স্থগিত রাখা উচিত।

এদিকে বিশ্বের অনেক অর্থনীতিই এখনও মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত মূল্যস্ফীতির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তা ২ শতাংশ। কিন্তু অনেক দেশেই মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে এই লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকছে। গত মাসে ইউরোজোনে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। যুক্তরাজ্যে আগস্টে ভোক্তা মূল্যসূচকভিত্তিক সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে আগামী এক বছরের মূল্যস্ফীতি নিয়ে মানুষের মধ্যম প্রত্যাশা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে পাঁচ বছরমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা ৩ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে।

কেউ কেউ মনে করেন, মূল্যস্ফীতির পেছনে প্রধানত ইরান যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে জ্বালানির দামও অনেক বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির এই চাপ সাময়িক হতে পারে। কিন্তু কাঠামোগত বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়া এবং সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না। কয়েকটি উন্নত অর্থনীতির দেশে সরকারি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে বা তা ছাড়িয়ে গেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে বোঝা যায়, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট এত সহজে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।

সরকারি ঋণ নিয়ে ঝুঁকির সঙ্গে আর্থিক বাজারের কিছু পরিবর্তনও যুক্ত হয়েছে। আগে পেনশন তহবিল ও বিমা কোম্পানির মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণপত্রের নির্ভরযোগ্য ক্রেতা হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু এখন তাদের জায়গা ক্রমেই দখল করছে হেজ ফান্ডগুলো (বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগ তহবিল), যেগুলো সাধারণত স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বিদেশি সরকারের হাতে থাকা বিপুল পরিমাণ মার্কিন সরকারি ঋণপত্র। এসব বিদেশি সরকারের মধ্যে চীনের মতো দেশও রয়েছে যাদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আরেকটি সম্ভাব্য সমস্যা হলো বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা এবং সংকটের সময়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ডলারের দীর্ঘদিনের অবস্থান এখন ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদভাণ্ডারে এখন স্বর্ণের পরিমাণ মার্কিন ট্রেজারি বন্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। ডলারের আধিপত্য যদি সত্যিই কমে যায় তাহলে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এবং অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের স্বাধীনতাও সংকুচিত হতে পারে।

বন্ডবাজারেও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতিফলন স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের ১০ বছরমেয়াদি ট্রেজারি বন্ড বা ঋণপত্রে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারী যে বার্ষিক রিটার্ন বা মুনাফা (সুদ) পান তার হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশের ওপরে রয়েছে। আর ৩০ বছরমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের বার্ষিক রিটার্ন ছাড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০০২ সালের পর এগুলো সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুদের হার। তবে এই পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের প্রায় সব বন্ডবাজারেই বার্ষিক রিটার্নের হার বেড়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ববাজারের মোট স্থির আয়ের বিনিয়োগপণ্যের মাত্র ১২ শতাংশের বার্ষিক রিটার্ন ছিল ৩ শতাংশের বেশি। বর্তমানে সেই হার প্রায় ৮৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

শেয়ারবাজারের পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষকদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে। অবশ্য গত পাঁচ বছরের ইতিহাসের তুলনায় শেয়ারবাজারের অস্থিরতা সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার একটি প্রচলিত সূচক— সিবিওই ভোলাটিলিটি ইনডেক্স বা ভিআইএক্স এখনও তুলনামূলক স্থিতিশীল। এই সূচকের মান প্রায় ১৫ দশমিক ৩১। কিন্তু শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের কেন্দ্রীভবন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রযুক্তি খাতের মাত্র সাতটি কোম্পানির হাতে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোর মোট বাজারমূল্যের ৩০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রীভূত রয়েছে। এছাড়া শেয়ারের দাম ও কোম্পানির মুনাফার অনুপাত বা প্রাইস-টু-আর্নিংস (পি/ই) রেশিও বেড়ে ২৬ দশমিক ৬ হয়েছে। গত ২৫ বছরের বড় একটি সময়জুড়ে এই অনুপাত ছিল প্রায় ১৬। অর্থাৎ কোম্পানিগুলোর মুনাফার তুলনায় তাদের শেয়ারের দাম এখন অনেক বেশি।

অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে রয়েছে সুস্থ অর্থনীতি ও সমাজের মৌলিক ভিত্তিগুলোর ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়া। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কর্মসূচির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী পড়া, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ক্রমেই কমছে। একইসঙ্গে অবকাঠামো খাতেও প্রয়োজনের তুলনায় বিনিয়োগ কম হচ্ছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সড়ক, রেলপথ, সেতু ও সমুদ্রবন্দরসহ সামগ্রিক অবকাঠামোর মানকে সি-গ্রেড দিয়েছে আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স।

সরকারি সেবার মান ও প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের পারস্পরিক বন্ধনও দুর্বল হচ্ছে। বাড়ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭২ শতাংশ রিপাবলিকান মনে করেন, ডেমোক্র্যাটরা অন্য আমেরিকানদের তুলনায় বেশি অনৈতিক। ২০১৬ সালে এই হার ছিল ৪৭ শতাংশ। একইভাবে ৬৩ শতাংশ ডেমোক্র্যাট রিপাবলিকানদের সম্পর্কে একই ধরনের ধারণা পোষণ করেন যেখানে ২০১৬ সালে এই হার ছিল ৩৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে গ্যালাপের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৮০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মনে করেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধের প্রশ্নে আমেরিকানরা গভীরভাবে বিভক্ত।

পুঁজিবাদ সম্পর্কেও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে এই বিভাজন স্পষ্ট। গ্যালাপের ২০২৫ সালের এক জরিপে ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা পুঁজিবাদ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। ২০২১ সালে এই হার ছিল ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ চার বছরে পুঁজিবাদ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব কমেছে। এই পতন মূলত ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে দেখা গেছে। উভয় গোষ্ঠীতেই পুঁজিবাদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব আট শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন হতে যাচ্ছে যা দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা নির্বাচনগুলোর অন্যতম হতে পারে।

বর্তমানে ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। সেখানে উগ্র ডানপন্থি দলগুলোর প্রতি সমর্থন ক্রমেই বাড়ছে। জার্মানির অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। অন্তত এটুকু বলা যায়, এই প্রবণতার ফলে রাজনৈতিক বিভক্তি আরও বাড়বে। আর এর প্রভাব পড়বে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে। সরকার একবার যে নীতি গ্রহণ করবে পরে তা পরিবর্তন করে ফেলতে পারে এমন অনিশ্চয়তা বাড়বে। অর্থনীতির ভাষায় একে নীতি প্রণয়নের সময়গত অসংগতি বা ‘টাইম ইনকনসিস্টেন্সি’ সমস্যা বলা হয়। এর পরিণতিতে নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন, বিনিয়োগ হ্রাস এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এসব কিছু ঘটছে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে। আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়ছে, একইসঙ্গে বিশ্বশক্তির ভারসাম্যও পরিবর্তিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তর, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পুঁজিপ্রবাহ এবং বিভিন্ন পণ্যের বৈশ্বিক দামের ওপর।

অবশ্য বাস্তবতার দিক থেকে শুধু এসব চ্যালেঞ্জের তালিকা তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়। কারণ, এর অনেকগুলোই ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে। তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি: এসব সমস্যা একই সময়ে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা বিরল আর সবগুলো একসঙ্গে সক্রিয় থাকলে তা অত্যন্ত বিপজ্জনকও হতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা যাদের হাতে রয়েছে তাদের কখনোই এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঝুঁকির মাত্রা ভুলে গেলে চলবে না।

যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের সদস্য ও অর্থনীতিবিদ

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাষান্তর ও সম্পাদনা: মাহবুবুল হাসান