জ্বালানি ও বাজেট নিয়ে ইইউ নেতাদের সম্মেলন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চীন থেকে পণ্য আমদানি বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপের বিভিন্ন কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে শিল্প খাতের সংগঠনগুলো। এ পরিস্থিতিতে চীনা পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানির উচ্চমূল্য মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ বাজেট নিয়ে মতভেদ দূর করতে গতকাল বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে সম্মেলনে বসেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নেতারা।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন থেকে হাইব্রিড গাড়ি আমদানি সীমিত করার বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশন বেইজিংয়ের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চীনের সঙ্গে পণ্য বাণিজ্যে ইইউর ঘাটতি কমানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে এই সমঝোতাকে। ২০২৫ সালে চীনের সঙ্গে ইইউর পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৩৬ হাজার কোটি ইউরোতে (৪০০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার) দাঁড়ায়। চলতি বছর তা আরও বাড়তে পারে। আগামী মার্চে ইইউ-চীন পরবর্তী বৈঠক হওয়ার কথা।

সম্মেলনের খসড়া সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, চীনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে ইউরোপীয় কমিশনকে আহ্বান জানাবেন নেতারা। একইসঙ্গে জোটের স্বার্থ রক্ষায় বিদ্যমান বাণিজ্য সুরক্ষাব্যবস্থার পূর্ণ ব্যবহার এবং নতুন বাণিজ্যিক হাতিয়ার যুক্ত করার বিষয়েও জোর দেওয়া হবে।

ইইউর এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, বাণিজ্যের এই ভারসাম্যহীনতা শুধু একটি খাতে সীমাবদ্ধ নয়। এ সমস্যা মোকাবিলায় হাতে বেশি সময় নেই। কারণ প্রতি মাসেই হাজার হাজার কর্মসংস্থান হারিয়ে যাচ্ছে।

ইউরোপে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। নির্বাচনে এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাচ্ছে উগ্র ডানপন্থি দলগুলো। গত জুনে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় অক্টোবরের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ফল আনার জন্য ইউরোপীয় কমিশনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ইইউ নেতারা। হাইব্রিড গাড়ি নিয়ে সমঝোতা সেই প্রচেষ্টার প্রথম সাফল্য হলেও রাসায়নিক পণ্য, ইস্পাত ও যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন খাতে বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা এখনও কাটেনি।

অন্যদিকে, বেইজিংয়ের বক্তব্য, অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি অতিরঞ্জিত করে সুরক্ষাবাদকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং দেশটির বাণিজ্য সীমিত করার চেষ্টা চলছে।

চীনা পণ্য আমদানিতে জার্মানির অবস্থান পরিবর্তন: গত সপ্তাহে প্রকাশিত ফ্রান্স ও জার্মানির যৌথ প্রস্তাব সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। ইউরোপের বৃহত্তম দুই অর্থনীতি রাসায়নিক পণ্য ও পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি) আমদানি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পিইটি এমন এক ধরনের প্লাস্টিক, যা প্যাকেজিংয়ে ব্যবহার হয়।

এ ছাড়া যেসব দেশ ইইউর স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে দেশ দুইটি। পিইটি আমদানির বিষয়ে শিগগির তদন্ত শুরু হতে পারে। এই প্রস্তাব জার্মানির অবস্থানে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ দুই বছর আগেও চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ইইউর ভর্তুকিবিরোধী শুল্ক আরোপের সবচেয়ে সোচ্চার বিরোধীদের মধ্যে ছিল জার্মানি।

গতকাল ইইউর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার মধ্য দিয়ে সম্মেলন শুরু হয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্কও এই আলোচনার অংশ। এ ছাড়া কয়েকটি সদস্য দেশ জ্বালানির উচ্চমূল্যকে আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। সম্মেলনের খসড়া সিদ্ধান্তে বিষয়টিকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জ্বালানির দাম কমাতে ইউরোপীয় কমিশনের আগের প্রস্তাবগুলোও আলোচনায় উঠে এসেছে। এর মধ্যে তেল ও গ্যাস আমদানিতে মিথেন নিঃসরণসংক্রান্ত ইইউর বিধি কার্যকরের সময়সীমা এক বছর পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে পরিস্থিতি সামাল দিতে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কমিশনকে অনুরোধ জানাবেন নেতারা।

সাত বছরের বাজেট নিয়ে আলোচনা: ইইউর পরবর্তী সাত বছরের বাজেট নিয়েও আলোচনা করেছেন নেতারা। ২০২৮ থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত মেয়াদের এই বাজেট অনুমোদনে সদস্যদেশগুলোর সর্বসম্মতি প্রয়োজন। বাজেট নিয়ে সাধারণত জোটের যেসব দেশ বেশি অর্থ দেয় এবং যেসব দেশ তুলনামূলক বেশি অর্থ পায়, তাদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। সমঝোতায় পৌঁছাতে আগামী মাসের শেষের দিকে বিশেষ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।

আজ শুক্রবার সম্মলনের দ্বিতীয় দিনে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় ‘ইউক্রেন সংকট’। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৭ সালে ইউক্রেনের অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন ইইউ নেতারা।

সম্মেলনের খসড়া সিদ্ধান্তে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্তে দুঃখ প্রকাশের কথাও রয়েছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেছেন, ইউক্রেনের নেতা হিসেবে জেলেনস্কির পরিবর্তে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত। তবে জেলেনস্কির প্রতি জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন ইউরোপীয় নেতারা।