জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:
দেশে গাড়ি চলছে, কারখানা চলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, আর এর পেছনে প্রয়োজন জ্বালানি। এই চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থের জ্বালানি আমদানি করে সরকার। কিন্তু, বিদেশ থেকে এই জ্বালানি কেনা হয় কীভাবে?
যে প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে কম দাম দেয়, তার হাতেই কি চলে যায় সরকারি চুক্তি? নাকি কম দামের পাশাপাশি দেখতে হয় আরও কিছু বিষয়? জ্বালানি আমদানির টেন্ডার কীভাবে হয়, সহজ ভাষায় আজ জেনে নেবো।
টেন্ডার শুরু হয় কীভাবে?
ধরুন, সরকারের নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন। প্রথমে ঠিক করা হবে কতটুকু জ্বালানি লাগবে, কী ধরনের জ্বালানি প্রয়োজন এবং কখন তা দেশে পৌঁছাতে হবে।
এরপর তৈরি হবে টেন্ডারের কাগজপত্র। সেখানে লেখা থাকবে জ্বালানির পরিমাণ, মান, সরবরাহের সময় এবং অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতার শর্ত।
সরকারিভাবে কেনার ক্ষেত্রে বর্তমানে কার্যকর পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস বা PPR 2025-এর বিধান অনুসরণ করতে হয়। ক্রয়ের ধরন অনুযায়ী টেন্ডার পদ্ধতিও ভিন্ন হতে পারে।
কারা টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে?
টেন্ডার আহ্বান করা হলে নির্ধারিত নিয়মে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিতে পারে। সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে e-GP ব্যবস্থায় টেন্ডার জমা ও খোলার ব্যবস্থা রয়েছে।
কিন্তু, এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। শুধু দরপত্র জমা দিলেই কোনো প্রতিষ্ঠান যোগ্য হয়ে যায় না।
প্রথমে দেখা হয়, প্রতিষ্ঠানটি টেন্ডারের শর্ত পূরণ করছে কিনা। তার প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা আছে কিনা, আর্থিক সক্ষমতা কেমন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা; এসব বিষয়ও যাচাই করা হয়। অর্থাৎ, কম দাম দেওয়ার পাশাপাশি যোগ্যতাও প্রমাণ করতে হয়।
সব ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। কারণ, জ্বালানি কেনার সময় শুধু দাম দেখলেই হবে না। জ্বালানির মান ঠিক আছে কিনা, নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করা সম্ভব কিনা এবং টেন্ডারের অন্যান্য শর্ত পূরণ হচ্ছে কিনা, এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
সহজভাবে বললে, কোনো প্রতিষ্ঠান কম দাম দিলেও যদি নির্ধারিত যোগ্যতা বা প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করে, তাহলে সেটি চুক্তির জন্য গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তাই সর্বনিম্ন দর আর চূড়ান্তভাবে গ্রহণযোগ্য দর, দুটি বিষয় এক নয়।
সব টেন্ডার কি একই রকম?
জ্বালানি আমদানির সব কাজ একই ধরনের টেন্ডারে হয় না। কী কেনা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে ক্রয় পদ্ধতি।
যেমন, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ মেট্রিক টন Arabian Light Crude Oil পরিবহনের জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করেছিল। এখানে মূল বিষয় ছিল, জ্বালানি পরিবহনের জন্য জাহাজ ভাড়া করা।
তাহলে একটি জ্বালানি আমদানির টেন্ডার কতটা স্বচ্ছ, তা বুঝতে জানতে হবে কতটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে, কী শর্ত ছিল, কারা যোগ্য হয়েছে এবং কেন নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন করা হলো।
কারণ, জ্বালানি কেনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের নিরাপত্তা ও বিপুল সরকারি অর্থ। তাই শুধু কম দাম নয়, পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাই গুরুত্বপূর্ণ।
কম দর দিলেই কি টেন্ডার পাওয়া যায়?
জ্বালানি আমদানির টেন্ডারে সবচেয়ে কম দাম দিলেই কি চুক্তি নিশ্চিত? বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
কারণ টেন্ডারে শুধু দাম নয়, দেখা হয় আরও কিছু বিষয়।
প্রতিষ্ঠানটি যোগ্য কিনা, পণ্যের মান ঠিক আছে কিনা, নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করা সম্ভব কিনা, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই কম দর দিলেই যে, কোনো প্রতিষ্ঠান চুক্তি পাবে, এমন নিয়ম নেই। টেন্ডারে দাম গুরুত্বপূর্ণ, তবে একমাত্র বিষয় নয়।
জ্বালানি টেন্ডারে সরবরাহকারী বাছাই হয় কীভাবে?
সরকার জ্বালানি আমদানির জন্য টেন্ডার আহ্বান করল। এরপর কী হয়?
প্রথমে দেখা হয়, দরদাতা টেন্ডারের শর্ত পূরণ করেছে কি না। দ্বিতীয় ধাপে যাচাই করা হয় পণ্যের মান ও প্রয়োজনীয় কারিগরি বিষয়। এরপর দেখা হয় দাম ও অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত। সবশেষে, নির্ধারিত নিয়মে যোগ্য দরদাতার মধ্য থেকে চুক্তির জন্য নির্বাচন করা হয়।
তাই একটি টেন্ডার বুঝতে শুধু কে কত কম দাম দিয়েছে, সেটি জানলেই হবে না। এর পুরো প্রক্রিয়াই বলে দেয়, কীভাবে সরবরাহকারী নির্বাচন করা হলো।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি