ফিরোজ শাহ, জামালপুর: শিক্ষা ও গবেষণায় বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তীব্র অবকাঠামোগত সংকটে ধুঁকছে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (জাবিপ্রবি)। শ্রেণিকক্ষ, আবাসন, পরিবহন ও গবেষণাগারের সংকটে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আশা, ১ হাজার ৫৭৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়িত হলে এসব সংকটের সমাধান হবে।
২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের ৪৪তম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় জাবিপ্রবি। জামালপুর শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে মেলান্দহ উপজেলার গোবিন্দগঞ্জে ১৬ একর জমির ওপর বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান। প্রতিষ্ঠার নয় বছর পেরিয়ে গেলেও ময়মনসিংহ বিভাগের একমাত্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম এখনও পুরোনো ফিশারিজ কলেজের অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটি বিভাগে ১ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। তাদের পাঠদানের জন্য শিক্ষক রয়েছেন ৫৮ জন। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ৯০।
বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিক হলগুলোতে আসন রয়েছে মাত্র ৩৫০টি। ফলে মোট শিক্ষার্থীর একটি সীমিত অংশই হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে জামালপুর শহরের বিভিন্ন মেসে থাকতে হচ্ছে। এতে বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে হচ্ছে। অন্যদিকে শহর থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াতের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিবহনব্যবস্থাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী সারোয়ার হাসান সজীব বলেন, ক্যাম্পাসে যাতায়াতের জন্য বাসের সংখ্যা কম থাকায় অনেক সময় বাসে ওঠার জায়গাও পাওয়া যায় না। বাস ধরতে না পারলে নির্ধারিত সময়ে ক্লাস বা পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। দূরত্ব ও যানজটের কারণে সকাল ৮টার ক্লাসে অংশ নিতে তাকে ভোর ছয়টায় ঘুম থেকে উঠতে হয়। একই বিভাগের শিক্ষার্থী অপি আজাদ শর্ণা বলেন, সকাল ৯টার পর গ্রন্থাগারে বসার জায়গা পাওয়া যায় না। এতে পড়াশোনা করতে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
আবাসন ও পরিবহনসংকটের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়েছে তীব্র শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণাগারসংকট। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী ৭০টির বেশি শ্রেণিকক্ষ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ৩০ থেকে ৩২টি। ফলে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের অভাবে গবেষণাগারগুলোও শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল (ইইই) বিভাগের চেয়ারম্যান মো. সিজার রহমান বলেন, শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে গবেষণাগারকেই শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করে পাঠদান চালিয়ে নিতে হচ্ছে। ফিশারিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাদীকুর রহমান জানান, বর্তমানে প্রতিটি বিভাগে তিনটি করে শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। সংকট মোকাবিলায় বিভাগগুলো নিজেদের মধ্যে শ্রেণিকক্ষ ভাগাভাগি করে কোনোমতে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে এসব সংকট নিরসনে একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সারোয়ার জাহান বলেন, পুরো বিষয়টি এখন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনার (ডিপিপি) ওপর নির্ভর করছে। ১ হাজার ৫৭৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্পটির নথি বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে গেছে। আশা করছি, শিগগিরই এটি প্রাক্-একনেক সভা এবং পরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হবে বলে আমরা আশাবাদী।
শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হোক।