জাতীয় অর্থনীতি আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আইনগতভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র ও কর সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক নথি বাতিল না করেই এক ব্যক্তিকে ভিনদেশি সন্দেহে দীর্ঘ দুই মাস ধরে বন্দিশিবিরে আটকে রাখার ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে উচ্চ আদালত। সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া এবং কেবল সন্দেহের বশে কাউকে এভাবে অন্যায়ভাবে আটক রাখা যায় কি না- তা নিয়ে আইনি ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত আগস্টের শুরুতে। স্থানীয় পুলিশ এক ব্যক্তিকে বিদেশি বা বহিরাগত; বিশেষত বাংলাদেশি সন্দেহে সীমান্ত সংলগ্ন রানিনগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তী সময়ে তড়িঘড়ি করে তাকে বিশেষ আটক কেন্দ্রে (ডিটেনশন সেন্টার) পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ দিন ধরে বন্দী থাকা ওই ব্যক্তির পক্ষে পরিবারের সদস্যরা আইনি প্রতিকার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। আবেদনকারীর নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের ইস্যুকৃত বৈধ আধার কার্ড ও প্যান কার্ডের মতো পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও তাকে আটক রাখা হয়।
মামলার শুনানিকালে ভারতের উচ্চ আদালতের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য কঠোর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলেন, সরকার কর্তৃক দেওয়া মূল পরিচয়পত্র বা নাগরিক নথিগুলো বাতিল না করে কীভাবে সরাসরি কাউকে ভিনদেশি নাগরিক হিসেবে ধরে নেওয়া সম্ভব? তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, যদি কোনো ব্যক্তি জটিলতার কারণে নিজের প্রয়াত পিতার সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক নথি দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন, তবেই কি তাকে সরাসরি বিদেশি বলে চিহ্নিত করে আটক রাখা যুক্তিযুক্ত? সীমান্ত এলাকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও দশকের পর দশক ধরে বসবাসকারী মানুষের জটিল বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে আদালত জানায়, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় ঘটিয়ে এভাবে কাউকে বন্দিশিবিরে রাখা মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার যুক্তি উপস্থাপন করে দাবি করেন, ওই ব্যক্তি ভূয়া বা জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্রগুলো তৈরি করেছিলেন। অবৈধ বা জালিয়াতি সনদের ওপর ভিত্তি করে নথি তৈরি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বহিষ্কার বা ডি পোর্টেশনের আইনি বিধান রয়েছে। তবে এর পাল্টা জবাবে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, কাউকে অবৈধ ঘোষণা বা নির্বাসনে পাঠানোর আগে তিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাগরিক তা প্রমাণের জন্য সমস্ত তথ্য ও প্রাসঙ্গিক নথি নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। তাড়াহুড়ো করে মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা সঠিক পদ্ধতি হতে পারে না। বিচারক পরবর্তীতে মামলাটি অন্য একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চে (বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের বেঞ্চ) স্থানান্তরের নির্দেশ দেন, যেখানে আগামী দিনে বিষয়টি বিস্তারিত শুনানির জন্য উপস্থাপিত হবে।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, দেশটির সরকারি কার্ড প্রস্তুতকারী কর্তৃপক্ষকে ওই ব্যক্তির জমা দেওয়া নথিপত্রের সত্যতা যাচাই করে লিখিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। নথিগুলোতে কোনো ধরনের জালিয়াতি ছিল কি না, নাকি কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে- তা প্রতিবেদন আসার পরেই স্পষ্ট হবে।
