শেয়ারবাজারের দুই নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নিজেরাই কেন তালিকাভুক্ত হতে পারছে না?
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

অনলাইন ডেস্ক: শেয়ারবাজারে অন্য কোম্পানির তালিকাভুক্তির পথ তৈরি করে দেয় যে দুই প্রতিষ্ঠান, তাদের নিজেদের তালিকাভুক্তিই আটকে আছে বছরের পর বছর। আইন হয়েছে, উদ্যোগ হয়েছে, বদলেছে নিয়মও। কিন্তু কাটেনি জট। ১৩ বছরেও তালিকাভুক্ত হয়নি ডিএসই-সিএসই।

শেয়ারবাজারের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা আলাদা করে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন করা হয়। এর আওতায় কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে।

পরিকল্পনা ছিল, দুই এক্সচেঞ্জের প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডারদের ৬০ শতাংশ শেয়ার ব্লকড অ্যাকাউন্টে রাখা হবে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ কৌশলগত বিনিয়োগকারীর কাছে এবং বাকি ৩৫ শতাংশ বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ছাড়ার কথা।

কিন্তু এক যুগ পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়ন হয়নি সেই তালিকাভুক্তি।

সর্বশেষ ২০২২ সালে ডিএসইকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেয় বিএসইসি। তবে সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি।

অন্যদিকে, গত বছরের ১২ আগস্ট ডিএসইতে সরাসরি তালিকাভুক্তির আবেদন করে সিএসই। কিন্তু পাঁচটি কারণ দেখিয়ে সেই আবেদন নাকচ করে কমিশন।

এর মধ্যে ছিল-ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের সঙ্গে প্রস্তাবের সাংঘর্ষিকতা, মূল ব্যবসা থেকে পরিচালন মুনাফা না থাকা, তথ্যপত্র বা প্রসপেক্টাস না থাকা এবং পরিচালনা পর্ষদ ও শেয়ারহোল্ডারদের সাধারণ সভার সিদ্ধান্তের কপি না থাকা। আর্থিক অবস্থাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিএসইর পরিচালন আয় কমে দাঁড়ায় প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বিপরীতে পরিচালন লোকসান বেড়ে হয় প্রায় ১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। যদিও বিনিয়োগ, সুদ ও অন্যান্য আয় মিলিয়ে বছর শেষে নিট মুনাফা হয়েছে প্রায় ২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

ডিএসইরও একই চিত্র। পরিচালন আয় কমে প্রায় ১০১ কোটি টাকায় নেমেছে। আর পরিচালন লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। তবে সুদ ও অন্যান্য আয় থেকে প্রায় ১২১ কোটি টাকা পাওয়ায় বছর শেষে নিট মুনাফা হয়েছে প্রায় ৩১ কোটি ২০ লাখ টাকা।

অর্থাৎ মূল ব্যবসায় লোকসান হলেও বিনিয়োগ ও অন্যান্য আয়েই টিকে আছে দুই এক্সচেঞ্জের মুনাফা।

এদিকে নতুন করে আশার আলোও তৈরি হয়েছে। গত ৪ অক্টোবর বেসরকারি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে ২০১০ সালে দেওয়া একটি নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর আইপিও ছাড়াই স্টক এক্সচেঞ্জে সিকিউরিটিজ তালিকাভুক্তির সুযোগ রেখে নতুন ডাইরেক্ট লিস্টিং রুলসের খসড়া অনুমোদন করেছে বিএসইসি।

তবে সেখানেও শর্ত রয়েছে-আবেদনকারীকে অন্তত তিন বছর ব্যবসায় থাকতে হবে, টানা দুই অর্থবছরে মূল পরিচালন ব্যবসা থেকে মুনাফা করতে হবে এবং সর্বশেষ অর্থবছরে পরিচালন নগদ প্রবাহ ইতিবাচক থাকতে হবে।

ফলে নতুন সুযোগ এলেও মূল ব্যবসায় পরিচালন মুনাফার শর্ত পূরণ করাই এখন ডিএসই-সিএসইর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিএসইর মূল আয় আসে ব্রোকারদের লেনদেনের ওপর আরোপিত চার্জ থেকে। দৈনিক লেনদেন ৭৫০ কোটি টাকার নিচে নেমে গেলে পরিচালন লোকসান হয়। অথচ গত কয়েক বছরে লেনদেন ছিল প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে।

অন্য কোম্পানিকে বাজারে তুলে ধরার দায়িত্ব যাদের, ১৩ বছরেও তারাই নিজেদের বাজারে তুলতে পারেনি। নতুন নিয়মে পথ কিছুটা সহজ হলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে-শুধু নিয়ম বদলালেই কি ডিএসই-সিএসইর তালিকাভুক্তি সম্ভব হবে, নাকি আগে ঘুরে দাঁড়াতে হবে তাদের মূল ব্যবসাকেই?  

 

—জা. অর্থনীতি/এলএটি