নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তি হলে বন্দর বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। একই সঙ্গে কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর যুক্ত করার উদ্যোগও বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সোমবার (৫ অক্টোবর) চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি থেকে এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
আন্দোলনকারীরা বলেন, এনসিটি নিয়ে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হলে শুধু বন্দর নয়, কুতুবদিয়া আউটার অ্যাঙ্করেজ পর্যন্ত সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘কোনো চুক্তি করার পদক্ষেপ নিলে সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ হয়ে যাবে। শুধু বন্দর নয়, কুতুবদিয়া আউটার অ্যাঙ্করেজ পর্যন্ত সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।’
তবে তারা কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা চান না জানিয়ে খোকন বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে তারা সহযোগিতা করতে চান। কিন্তু বন্দর শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো অস্থিতিশীলতা চাই না। আমরা গণতান্ত্রিক সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। কিন্তু আপনাদের জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে হবে এবং তাদের মতামতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’
জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বন্দর পরিচালনা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান ইব্রাহিম খোকন। তার দাবি, জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হলে শ্রমিকরা সরকারকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন।
তিনি বলেন, ‘জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিলে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। অন্যথায় চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবি বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে যারা অবস্থান নিয়েছেন, সেই বন্দর শ্রমিক, কর্মচারীসহ সবাই তাদের সর্বশক্তি দিয়ে সারা দেশে গণআন্দোলনের মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।’
সরকারের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের দাবি
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বন্দর শ্রমিকদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সরকারের বৈঠকের দাবি জানিয়েছেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ে শুরু হওয়া একটি চুক্তি বর্তমান সরকার বাতিল করবে বলে তারা আশা করেছিলেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম, এই সরকারের আমলে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে চাকরি করতে পারব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এবং পরবর্তী সরকার এগিয়ে নেওয়া একটি চুক্তি এখন আবার সামনে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’
তিনি জানান, এ বিষয়ে মন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তারা আলোচনা করেছেন। শুরুতে চুক্তিটি আর এগোবে না বলে তারা ধারণা করেছিলেন।
তার অভিযোগ, এখন একটি স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব ও উসকানিতে চুক্তিটি আবার এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের একটি প্রতিনিধি দলকে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসানোর আহ্বান জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও আন্দোলনরত শ্রমিকদের একটি প্রতিনিধি দলকে ডাকুন এবং আমাদের সঙ্গে বসুন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি আপনাদের বোঝাতে পারি, তাহলে কোনো অবস্থাতেই চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেবেন না। আর যদি আমরা আপনাদের বোঝাতে ব্যর্থ হই, তাহলে আপনারা আপনাদের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’
ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ও শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) নেতা তপন দত্ত বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’। এটি বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।
শ্রমিকদের দাবি উপেক্ষা করা হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
তপন দত্ত বলেন, ‘মানুষের কথা যদি না শোনা হয়, তাহলে মানুষ বিভিন্ন পথে যায়। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ।’
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের পরিচালনায় শ্রমিকদের ভূমিকা খর্ব করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা মেনে নেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘নেতারা ইতোমধ্যে বলেছেন, প্রয়োজন হলে বন্দর বন্ধ করে দেওয়া হবে। আরও উসকানি দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট সব সংগঠন বন্ধ রাখার মতো শক্তি আমাদের আছে।’
আন্দোলন জোরদারে ধারাবাহিক কর্মসূচিও ঘোষণা করেন তপন দত্ত। তিনি জানান, আগামী ৭ অক্টোবর শ্রমিকরা মশাল মিছিল করবেন। ১৩ অক্টোবর বন্দর চেয়ারম্যানকে ঘিরে কর্মসূচিসহ আরও কয়েকটি কর্মসূচি পালন করা হবে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান আন্দোলনকারীরা।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টুর সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন শ্রমিক নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার, এস কে খোদা তোতনসহ অন্যরা।
—জা. অর্থনীতি/এনজে