আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আকাশসীমা ব্যবহারে ইসলামাবাদের আপত্তির জন্য নয়, বরং ‘কারিগরি কারণে’ (টেকনিক্যাল ইস্যু) আটকে আছে বাংলাদেশের পাবনার রূপপুরে অবস্থিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি ইউরেনিয়ামের চালান। সোমবার ঢাকার পাকিস্তান হাই কমিশন থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে এ তথ্য।
পাকিস্তান হাই কমিশনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিনীতির প্রতি অবিচলভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কূটনৈতিক ফ্লাইট এবং আকাশসীমা অতিক্রমের (ওভারফ্লাইট) অনুমতি সংক্রান্ত যাবতীয় আবেদন/অনুরোধ আমাদের প্রতিষ্ঠিত নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশিকা ও বেসামরিক বিমান চলাচল সংক্রান্ত প্রোটোকল মেনে একটি সুনির্দিষ্ট ও প্রত্যাশিত সময়সীমার মধ্যে পর্যালোচনা ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে যা এসেছে, তা মূলত ফ্লাইট রুট বা যাত্রাপথ এবং আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতির মতো কারিগরি ও পদ্ধতিগত ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ রকম পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে এবং এর ফলে ফ্লাইটসূচিতে পরিবর্তন বা সমন্বয় করার দরকার হতে পারে।
বাংলাদশেকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র উল্লেখ করে সোমবারের বিবৃতিতে পাকিস্তানি হাইকমিশনের পক্ষ থেকে বলো হয়েছে, বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের বিষয়টিকে পাকিস্তান অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। তাই এই বিষয়টিকে যথাযথ কারিগরি প্রেক্ষাপটে দেখাই সমীচীন হবে। এমন কোনো প্রতিবেদন বা প্রচারণাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়, যা আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে বিষয়টিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করতে পারে।
উল্লেখ্য, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়ামের চালান গত ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এসে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু পাকিস্তান তার আকাশসীমা ব্যাবহারে আপত্তি জানানোয় এখনও ঢাকায় এসে পৌঁছায়নি সেই চালান।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম টেলিফোনে এএনআই-কে বলেছেন, আমরা শুনেছি যে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়াম বহনকারী একটি কার্গো বিমান ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল; কিন্তু বিমানটিকে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি, তাই পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউরেনিয়াম বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারেনি। পাকিস্তান কেন আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি, তার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ এখন পর্যন্ত আমরা জানতে পারিনি।
বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এএনআই-কে টেলিফোনে বলেন, আমরা বিমানবন্দরে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে অপেক্ষা করছিলাম, কিন্তু রোসাটমের (রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পরমাণু শক্তি প্রতিষ্ঠান) লিয়াজোঁ কর্মকর্তা আমাদের জানান যে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া যায়নি। তাই পরমাণু জ্বালানি পাঠানো সম্ভব হয়নি। হয়তো পরিবর্তিত সময়সূচিতে এটি আসবে।
প্রতিমন্ত্রী অবশ্য বলেছিলেন যে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ইউরেনিয়ামের চালান ঢাকায় এসে পোঁছাবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে রাশিয়া।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র পরমাণু জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র । পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলায় পদ্মা নদীর তীরে রোসাটমের কারিগরি সহায়তা এবং বাংলাদেশের পরমাণু শক্তি কমিশনের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই প্রকল্পটিতে তৃতীয় প্রজন্মের দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর ইউনিট রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
প্রথম ইউনিটের জন্য স্বল্পমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানির প্রথম চালান ২০২৩ সালের অক্টোবরে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসে। রোসাটমের নভোসিবিরস্ক কেমিক্যাল কনসেনট্রেটস প্ল্যান্টে তৈরি ১৬৪টি নতুন ফুয়েল অ্যাসেম্বলি রাশিয়ার একটি কার্গো উড়োজাহাজে করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনা হয়।
পরে বিকিরণ প্রতিরোধী কনটেইনারে করে সুরক্ষিত 'গ্রিন করিডর'-এর মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া হয় ওই জ্বালানি। এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন।
গত এপ্রিলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পথ তৈরি হয়।
সূত্র : এএনআই
—জা.অর্থনীতি/জেআরটি