জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: যে ইলিশ কিনতে ঢাকার কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী কিংবা নিউমার্কেটে সাধারণ ক্রেতার সাধারণ মানিব্যাগ শূন্য হয়ে যায়, সেই ইলিশই সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ঢুকছে মাত্র ২৫০ টাকা কেজিতে।
বাংলাদেশ কাস্টমস, বেনাপোল স্থলবন্দর ও মৎস্য অধিদপ্তরের সুনির্দিষ্ট নথি বলছে, সম্প্রতি পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে ১৯টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে কয়েক শত মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি করেছে। আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী আমদানি পর্যায়ে প্রতি কেজি ইলিশের দাম পড়েছে মাত্র দুই ডলার, যা আমাদের দেশীয় মুদ্রায় সর্বোচ্চ ২৪৬ টাকার কাছাকাছি। এর সঙ্গে সরকারের শুল্ক, দীর্ঘ পরিবহণ খরচ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটানোর পরও প্রতিটি ইলিশের দাম সর্বোচ্চ ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকার বেশি হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
কিন্তু সীমান্ত পেরিয়ে আমাদের দেশীয় পাইকারি আড়ত আর খুচরা বাজারে আসার পর হঠাৎ করেই বদলে যায় এই ছবির দৃশ্যপট। আড়তদার, পাইকার আর সিন্ডিকেটের অশুভ হাতবদলে সেই ৪০০ টাকার ইলিশ এক লাফে পৌঁছে যায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। আমদানি পর্যায়ের দামের সঙ্গে আমাদের সাধারণ ভোক্তার কেনা দামের এই পাহাড়সম ব্যবধান কেবল পরিবহণ খরচের জন্য নয়, বরং বাজারের প্রতিটি স্তরে অশুভ মধ্যস্বত্বভোগীদের বেপরোয়া মুনাফালোভী মানসিকতার স্পষ্ট প্রমাণ।
অন্যদিকে আমাদের রূপালী ইলিশের মূল যে উৎস, সেই দেশীয় উৎপাদনও দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। মৎস্য দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশে ইলিশের উৎপাদন কয়েক ১০ হাজার মেট্রিক টন কমে গিয়েছে। আমাদের নদীগুলোর ভয়াবহ দূষণ, অনিয়ন্ত্রিত ড্রেজিং, নদীর নাব্যতা সংকট এবং মা-ইলিশ ও জাটকা নিধনের মতো অনিয়মগুলো দেশীয় ইলিশের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি একেবারে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অথচ ঠিক উল্টো চিত্রে ভারতের গুজরাটের নর্মদা নদীর মোহনায় অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে সেখানকার ইলিশের ফলন হয়েছে অবিশ্বাস্য রকমের বেশি। আর সেই ইলিশই এখন বাজার ঘুরে বাংলাদেশে আসছে। দেশের উৎপাদন বাড়াতে শত কোটি টাকার সরকারি প্রজনন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও সাধারণ মানুষ কিন্তু তার সুফল পাচ্ছে না। সীমান্ত থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত শক্তিশালী মূল্যশৃঙ্খল পর্যবেক্ষণ এবং অসাধু মজুতদারদের সিন্ডিকেট না ভাঙলে রূপালী ইলিশ কেবল বাজারের দূরবর্তী স্বপ্ন হয়েই থাকবে।
ভারত থেকে যে ইলিশ কেজিপ্রতি মাত্র ২৪৬ টাকায় আমদানি হচ্ছে, ঢাকার বাজারে তা কেন আঠারোশো থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে? কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী শুল্ক ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে কেজিতে সর্বোচ্চ সাড়ে চারশো টাকা খরচ হওয়ার কথা। কিন্তু মাঝপথে সিন্ডিকেট আর মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজিতে ইলিশের দাম বাড়ছে চার থেকে পাঁচ গুণ! প্রতিদিনের এই প্রকাশ্য লুটপাট বন্ধ করবে কে?
একদিকে দেশে হু হু করে কমছে ইলিশের উৎপাদন, অন্যদিকে ভারত থেকে মাত্র আড়াইশো টাকায় আনা ইলিশ কিনে পকেট খালি হচ্ছে সাধারণ মানুষের। নদীর নাব্যতা সংকট আর দূষণে ইলিশের উৎপাদন কমায় তৈরি হয়েছে চরম সংকট। আর এই সুযোগে আমদানিকৃত কম দামি ইলিশে আকাশচুম্বী লাভ ছাঁটছে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী। ইলিশ কি তবে শুধু ধনীদের খাবার হতে চলেছে?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
