জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে বর্তমান সরকার। তবে নতুন ঋণ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ চীনা অর্থায়নে নতুন সমীকরণ চ্যালেঞ্জ সুফল ফেরানো। অতীতে চীনের অর্থায়নে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় ও মেয়াদ বাড়া, উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন এবং অর্থ ছাড়ে জটিলতার অভিজ্ঞতা রয়েছে বাংলাদেশের।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে গত জুনে মালয়েশিয়া ও চীন যান তারেক রহমান। চীন সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়।
এর মধ্যে ১৩টি সরকারি পর্যায়ের, তিনটি বিডার সঙ্গে চীনা অংশীদারদের এবং একটি বিএনপি ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে। পাশাপাশি তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, বন্দর ও পানি প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের জন্য চীনা বাজার সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে অর্থায়ন, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে সরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকার কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, বাংলাদেশের জন্য চীনের অর্থায়নের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে। বড় আকারের অবকাঠামো অর্থায়ন তুলনামূলক দ্রুত এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক শর্ত ছাড়াই দেওয়ার সক্ষমতা চীনের রয়েছে।
২০১৬ সালে শি জিন পিংয়ের ঢাকা সফরে ২৭টি প্রকল্পে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ১৩টি প্রকল্পে ঋণচুক্তি হয়েছে ৮ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের। নতুন ঋণের শর্ত হিসেবে সুদ কমানো ও ঋণ পরিশোধের অবকাশ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
তিস্তা ও পদ্মার পানি ব্যবস্থাপনায় চীনের সহযোগিতা, বন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষায়ও চীনের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা রয়েছে; ২০১৯-২৩ সময়ে দেশের অস্ত্র আমদানির প্রায় ৭২ শতাংশ এসেছে চীন থেকে।
বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে পদ্মা রেলসংযোগের ব্যয় বেড়েছে, কর্ণফুলী টানেলে যান চলাচল প্রত্যাশার তুলনায় কম, আর ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ব্যয় ও মেয়াদ বেড়েছে। জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডাবল লাইন প্রকল্পে আবার চীনা অর্থায়নই পাওয়া যায়নি।
এদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি ১৮ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার হলেও রপ্তানি মাত্র ৬৯৪ মিলিয়ন ডলার। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার।
ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য রেখে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ালেও মূল চ্যালেঞ্জ এখন নতুন ঋণ নেওয়া নয়, সেই অর্থ থেকে কতটা আয়, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও রপ্তানি বাড়ানো যায়—তা নিশ্চিত করা।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশের কাছে চীনের পাওনা প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া এআইআইবির ঋণ প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন এবং চীনা কোম্পানির বিনিয়োগ প্রায় ৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় অর্ধেক জ্বালানি খাতে।
তাই শুধু নতুন ঋণ নয়, বিনিয়োগ থেকে শিল্প, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও রপ্তানি বাড়ানোই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত। চীনা অর্থায়নের সাফল্য এখন ঋণের পরিমাণে নয়, প্রকল্প থেকে কতটা আয় ও অর্থনৈতিক সুফল মিলছে—তার ওপর নির্ভর করছে।
—জা.অর্থনীতি/জেআরটি