যশোর প্রতিনিধি: আমন চাষের ভরা মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন যশোরের কৃষকেরা। চাহিদার তুলনায় কম সার পাওয়া, একাধিক দোকান ঘুরেও সার না মেলা এবং সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে সার কেনার অভিযোগ করছেন তারা। বিশেষ করে ইউরিয়া ও টিএসপি নিয়ে বেশি বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। কোথাও কোথাও খুচরা পর্যায়ে কেজিপ্রতি পাঁচ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে কৃষি বিভাগের দাবি, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ ও মজুত রয়েছে। ফলে সরকারি হিসাবে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও কৃষকেরা কেন চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা গ্রামের কৃষক হজরত আলী প্রায় ২৪ বছর ধরে চাষাবাদ করছেন। এবার তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। তার অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
হজরত আলী বলেন, ইউরিয়ার সরকারি দাম ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা। কিন্তু তাকে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। পটাশ সারও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার চাঁচড়া এলাকার কৃষক আবুল কাশেম এবার ১৫ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। তার হিসাবে, প্রতি দুই বিঘা জমির জন্য এক বস্তা করে ইউরিয়া ও টিএসপি প্রয়োজন। সে হিসাবে সাত বস্তা সার প্রয়োজন হলেও পেয়েছেন চার বস্তা।
তিনি বলেন, সার পেতে একাধিক জায়গায় ঘুরতে হচ্ছে। এর ওপর বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ডিলাররাও বলছেন, তারা চাহিদামতো সার তুলতে পারেননি।
ঝিকরগাছার নারাঙ্গালী গ্রামের কৃষক আব্দুল আলিম চার বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। টিএসপি পেতে তাকে খোলা বাজারে ঘুরতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রতি কেজি ৫২ টাকা দরে ২০ কেজি টিএসপি এবং প্রতি বস্তা ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে দুই বস্তা ইউরিয়া কিনেছেন তিনি।
আব্দুল আলিম বলেন, ‘ক্ষেতে টিএসপি দিতে হবে। কিন্তু ঠিকমতো পাচ্ছি না। অনেক কষ্ট করে খোলা বাজার থেকে কিনেছি।’
মণিরামপুর উপজেলার বেড়েলা গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ শাহিনও একই অভিযোগ করেন। পাঁচ বিঘা জমিতে আমন চাষ করা এই কৃষক জানান, প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৬০০, টিএসপি ১ হাজার ৮০০ এবং ডিএপি ১ হাজার ৪০০ টাকা দরে কিনেছেন।
সদরের আরবপুর ইউনিয়নের পতেঙ্গালি গ্রামের কয়েকজন কৃষক বলেন, প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে তাদের একাধিক দোকান ঘুরতে হচ্ছে। দুই বস্তা ইউরিয়া ও দুই বস্তা টিএসপি প্রয়োজন হলেও অনেক ঘোরাঘুরি করে এক বস্তা পাওয়া যাচ্ছে। ডিএপি সাব-ডিলারদের কাছেও মিলছে না বলে অভিযোগ তাদের।
কৃষকদের ভাষ্য, খুচরা পর্যায়ে সার কিনতে গেলে কেজিপ্রতি প্রায় পাঁচ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে। এতে আমন চাষের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে না পারলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।
এক কৃষক বলেন, স্বাভাবিক সময়ে বিঘাপ্রতি ২০ মণ ধান উৎপাদন হলেও এবার পর্যাপ্ত সার না পেলে ফলন ১২ থেকে ১৩ মণের বেশি নাও হতে পারে।
অভিযোগের পর কৃষকের বাড়িতে গিয়ে বক্তব্য নেওয়া
চৌগাছার কয়েকজন কৃষক সার না পাওয়ার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে জানানোর পর তাদের বাড়িতে গিয়ে লিখিত বক্তব্য নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কৃষি বিভাগের বিরুদ্ধে। কৃষকদের দাবি, তাদের কাছ থেকে লিখিতভাবে নেওয়া হয়েছে যে তারা চাহিদা অনুযায়ী সার পেয়েছেন। এমনকি ওই বক্তব্য না দিলে পরবর্তী সময়ে সার পেতে সমস্যা হতে পারে বলেও তাদের বোঝানো হয়েছে।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোশাব্বির হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কৃষকদের কাছে গিয়েছি। ভাউচার অনুযায়ী তারা যে পরিমাণ সার পেয়েছেন, সেটিই লিখে নেওয়া হয়েছে। এখানে জোরজবরদস্তির কোনো বিষয় নেই।’
ডিলারদেরও অনিশ্চয়তার অভিযোগ
সার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডিলার বলেন, আগে দেশে ৪৪ হাজার খুচরা সার বিক্রেতা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। ফলে বর্তমান ডিলাররাও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
তার দাবি, ডিলারদের বাজারে টাকা আটকে আছে। নতুন করে সার তুললে বকেয়া বাড়ছে। আবার ভবিষ্যতে ডিলারশিপ বাতিল হয়ে গেলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে।
বেশি দামে সার বিক্রিতে জরিমানা
কৃষকদের বাড়তি দামে সার কেনার অভিযোগের মধ্যে প্রশাসনের অভিযানেও সরকার নির্ধারিত দামের বেশি দামে সার বিক্রির প্রমাণ মিলেছে।
গত ২ আগস্ট অভয়নগর উপজেলার মরিচা বাজারে মেসার্স মাসুদ-মামুন ট্রেডার্সের মালিক মাসুদ মোল্লাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫০ টাকা মূল্যের এক বস্তা টিএসপি ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগে তাকে এ জরিমানা করা হয়।
একই অভিযানে শুভরাড়া বাবুরহাট বাজারের মেসার্স ভাই ভাই কৃষি স্টোরের মালিক রিয়াজ উদ্দীনকে ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আশীষ কুমার বসুর নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযানটি পরিচালনা করেন।
বরাদ্দ আছে, সংকট নেই: কৃষি বিভাগ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমে জেলায় ইউরিয়া সারের চাহিদা ৬৮ হাজার ৯০৩ মেট্রিক টন, টিএসপি ১৭ হাজার ৫৯৮ মেট্রিক টন, ডিএপি ৪৩ হাজার ২২৫ মেট্রিক টন এবং এমওপি ২৫ হাজার ৫১১ মেট্রিক টন। এসব সারের বিপরীতে বরাদ্দও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আবুল হোসেন বলেন, ‘যশোরে সারের কোনো সংকট নেই। হয়তো কোনো কোনো জায়গায় কৃষকেরা সাব-ডিলারদের কাছ থেকে সার কিনতে গিয়ে একটু বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।’
তিনি জানান, বাঘারপাড়া উপজেলার কয়েকটি এলাকায় কৃষক ও ডিলারদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় সারের সরবরাহ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, কোথাও কোথাও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সমস্যা বা ডিলারদের অনিয়মের কারণে কৃষকেরা ভোগান্তিতে পড়তে পারেন। তবে সামগ্রিকভাবে জেলায় সারের কোনো সংকট নেই।
অন্যদিকে মাঠের কৃষকদের বক্তব্য, ‘সংকট নেই’ কৃষি বিভাগের এই দাবি তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলছে না। প্রয়োজনের তুলনায় কম সার পাওয়া, একাধিক দোকান ঘুরেও সার না পাওয়া এবং বেশি দামে সার কেনার অভিযোগই তাদের মুখে।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, এবার যশোরে ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ জমির আবাদে প্রয়োজনীয় সার বরাদ্দ ও মজুত থাকার পরও যদি কৃষকের হাতে নির্ধারিত দামে না পৌঁছায়, তাহলে সরবরাহব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি