ইবি প্রতিনিধি: গবেষণায় চুরির অভিযোগ, তথ্যগত অসঙ্গতি ও বিভিন্ন অনিয়মের কারণে আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অন্তত ১২টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের (রিট্র্যাক্ট) ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ঘটনাটির প্রকৃত কারণ ও সত্যাসত্য নির্ধারণে গঠিত ৩ সদস্যের এই কমিটিকে আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
রবিবার (৮ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক দ্যা ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস-কে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তদন্ত কমিটিতে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মমতাজুল ইসলামকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন—ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম এবং ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আসাদ-উদ-দৌলা।
আন্তর্জাতিক গবেষণা-স্বচ্ছতা পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম ‘রিট্র্যাকশন ওয়াচ’ ও সংশ্লিষ্ট জার্নালগুলোর নোটিশ পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রগুলোর মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ দুই শতাংশ গবেষকের তালিকায় থাকা কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুর রহমানের একটি, গণিত বিভাগের শিক্ষক ড. এস এম মোস্তফা কামালের দুটি এবং ড. মো. সজীব আলীর দুটি গবেষণাপত্র রয়েছে।
এছাড়া আইসিটি বিভাগের শিক্ষক ড. মো. সাদেক আলীর একটি, ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক ড. মো. কামরুজ্জামান ও মো. আতিকুর রহমানের দুটি, একই বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী আলমগীর হোসেনের একটি, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী শাহেদুর রহমান ও আসিফ ইকবালের দুটি এবং আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থী এন. গাফফারের একটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে।
প্রকাশিত এসব গবেষণাপত্রে পরবর্তীতে মারাত্মক অনিয়ম ও ত্রুটি ধরা পড়ায় ২০১১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত বিভিন্ন জার্নাল নিবন্ধগুলো প্রত্যাহার করে। এলসেভিয়ার (Elsevier), স্প্রিঞ্জার নেচার (Springer Nature), উইলি (Wiley), হিন্দাউই (Hindawi), বিএমসি (BMC) এবং এমডিপিআই (MDPI)-এর মতো বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থার জার্নাল থেকে নিবন্ধগুলো রিট্র্যাক্ট করা হয়। মূলত গবেষণাপত্রে লেখকত্ব বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নিয়ে জালিয়াতি, রেফারেন্সিং সমস্যা, ছবিতে অসঙ্গতি/ডুপ্লিকেশন এবং অবিশ্বস্ত ফলাফলের কারণে জার্নালগুলো এ কঠোর ব্যবস্থা নেয়।
গবেষণাপত্রে নাম থাকার বিষয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, "একটি পেপারে একাধিক লেখক থাকেন এবং সবার ভিন্ন ভূমিকা থাকে। মূলত পাবলিকেশন ফি (Publication Fee) মওকুফের সুবিধার্থে আমার নাম যুক্ত করা হয়েছিল। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় এই ছাড় পাওয়া যায়। গবেষণাটি পুরোপুরি বিদেশি লেখকদের ছিল, তবে বিষয়টি আমার মূল গবেষণা ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।"
গণিত বিভাগের শিক্ষক ড. এস এম মোস্তফা কামাল দাবি করেন, "কোনো পেপার রিট্র্যাক্ট হলে সাধারণত জার্নাল থেকে লেখককে জানানো হয়, কিন্তু আমাকে তারা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।"
একই বিভাগের শিক্ষক ড. মো. সজীব আলী বলেন, "পেপার সাবমিটের পর যথাযথ রিভিউ ও রিভিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সেটি প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশের প্রায় দুই বছর পর জার্নাল কর্তৃপক্ষ জানায় যে, পেপারটি স্পেশাল ইস্যুতে একজন গেস্ট এডিটর হ্যান্ডেল করেছিলেন এবং রিভিউ প্রক্রিয়া জার্নালের মানদণ্ড অনুযায়ী হয়নি। তাই তারা একযোগে একাধিক পেপার প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। আমি কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে লিখিতভাবে দ্বিমত পোষণ করেছি, যা তারা এডিটরিয়াল নোটে রেকর্ড হিসেবে রেখেছে।"
তবে এ বিষয়ে ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের ড. মো. কামরুজ্জামানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
গবেষণায় অনিয়মের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে কি না জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার বলেন, "আমার জানা মতে, এ ধরনের নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক কোনো নীতিমালা নেই। তবে উপাচার্যের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।"
এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, "ইতিমধ্যে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যেসব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই, সেখানে উপাচার্য প্রদত্ত সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।"
—জা. অর্থনীতি/এলএটি