- সাক্ষাৎকার -
ড. মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ, সিনেটের স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত সদস্য। ২০২০ সালে ভারতের নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটিভ রিসার্চ ইন হিউমিনিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেসের (সিআইআরএইচএসএস) পরিচালক। তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে অভ্যুত্থানের নানা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে কথা বলেছেন জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিদারুল হক-
জাতীয় অর্থনীতি: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল কারণগুলো কী ছিল? এটি কি শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল, নাকি দীর্ঘদিনের ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ?
অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী: গণ-অভ্যুত্থান আসলে শুধু একটি রাজনৈতিক কারণে সংগঠিত হয় না। একটা আন্দোলন তখনই গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয় যখন দেশের আপামর জনসাধারণ সেখানে অংশগ্রহণ করে এবং সেই অংশগ্রহণকারী জনগণের মধ্যে অনেকেই রাজনৈতিকভাবে সচেতন নাও হতে পারে। এর অর্থ হলো, গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক কারণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনেক বিষয় জড়িত থাকে। সেখানে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকসহ নানা ক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে ওঠে। যখন একটা সমাজে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য বিরাজ করে এবং সেই বৈষম্যের দ্বারা সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তারা অভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি গণতন্ত্রের চর্চা না হয় তাহলে সেই দলের নিষ্ঠাবান নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হবে এবং দলের মাঝে হাইব্রিড নেতৃত্ব তৈরি হবে। এভাবে রাজনৈতিক দলের মধ্যেও বৈষম্য তৈরি হতে পারে। ফলে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক— সব ক্ষেত্রে বিদ্যমান বঞ্চনা, বৈষম্য ও নিপীড়ন ভূমিক রেখেছে।
জাতীয় অর্থনীতি: এ গণ-অভ্যুত্থানে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের ভূমিকা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার কারণ কী?
অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী: ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শিক্ষার্থীদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। যদিও তাদের পেছনে ছিলেন কিছু শিক্ষক, যারা ভাষা আন্দোলনের দার্শনিক ভিত্তি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আন্দোলনটা সংগঠিত করেছে শিক্ষার্থীরা। ছয় দফা আন্দোলনকে যখন কঠোরভাবে দমন করার পথ বেছে নিয়েছিল আইয়ুব খান তখন ১৯৬৮ সালে আমাদের শিক্ষার্থীরা রাজনীতির হাল ধরেছিল। জাতীয় রাজনীতি যখন সংকটে পতিত, ঠিক সেই সময় দুটি ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে ১১ দফার আন্দোলন শুরু করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও শিক্ষার্থীদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীরাই নেতৃত্ব দিয়েছে। একই রকম ঘটনা ঘটেছে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানেও।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের প্রতি দেশের সাধারণ মানুষ আস্থা রেখেছে। সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। দেশের ধনিক শ্রেণির সন্তানরা সাধারণত সরকারি চাকরি খোঁজে না। সরকারি চাকরি প্রত্যাশা করে কারা? দেশের সাধারণ মানুষের সন্তানরা, যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে। এই শিক্ষার্থীরা সারা দেশের সাধারণ মানুষের সন্তান। এই শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরি পাওয়ার স্বপ্নটা তাদের বাবা-মায়ের স্বপ্নের সঙ্গে অভিন্ন। ফলে এই শিক্ষার্থীরা যখন কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে, তাদের পিতা-মাতা, অভিভাবক তথা দেশের সাধারণ মানুষ তাদেকে সমর্থন জুগিয়েছে। সেই বৈষম্যমূলক কোটাবিরোধী বা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর সরকার যখন দমন নিপীড়ন চালিয়েছে, তাদের বুকে গুলি ছুড়েছে তখন এ দেশের মানুষ রাস্তায় নেমেছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে যখন পাকিস্তান সরকার শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালায় তখন এ দেশের মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে আসাদ হত্যাকাণ্ডের পর মানুষ রাস্তায় নেমেছে। ১৯৮৭ সালে নূর হোসেন হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এদেশের মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। যার ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং স্বৈরাচার এরশাদের পতন হয়। চব্বিশের আন্দোলনে যখন রাস্তায় ইয়ামিন, আবু সাঈদ, মুগ্ধের মতো তাজা ঝরেছে তখন এ দেশের মানুষ গভীর বেদনা ও ক্ষোভে তাড়িত হয়েছে। ছাত্রদের প্রতি মমত্ববোধের কারণেই এদেশের মানুষ রাস্তায় নেমে আন্দোলনে সাড়া দিয়েছিল।
জাতীয় অর্থনীতি: গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলো। দুই বছরে গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়েছে?
অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আমাদের মাঝে একটি অভূতপূর্ব ঐক্য তৈরি হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর সেই ঐক্যটা আর থাকেনি। ঐক্যটা ভেঙে যায়। গণ-অভ্যুত্থানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন দলমতের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর সেই ঐক্যটি আর থাকেনি। গণ-অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব বা মালিকানা কিছু মানুষ বিশেষ করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক-শিক্ষার্থী কুক্ষিগত করে ফেলে। যার ফলে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়। নারী শিক্ষার্থীরা এই গণ-অভ্যুত্থানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নারী শিক্ষার্থীদের কোনো মূল্যায়ন হয়নি। উপরন্তু সেই নারীদের পোশাক নিয়ে কটাক্ষ করা হয়েছে, রাস্তায় নারীদের হেনস্তা করা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা দরকার। দেশের আপামর জনসাধারণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যখন একটা গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি তৈরি হলো, সেই শক্তিটা কোনোভাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি ছিল না। সেই শক্তিটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটা শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের যে স্বপ্নগুলো স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও অর্জিত হয়নি, এই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষ সেই স্বপ্নগুলো অর্জন করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমরা ৫ আগস্টের পর দেখেছি, সেই শক্তির মাঝখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী একটা শক্তি মাথাচাড়া দিল। মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো ভেঙে ফেলা হলো। মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক ৩২ নম্বর বাড়িটি কয়েক দফায় ধ্বংস করা হলো। অনেকেই চব্বিশকে একাত্তরের এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিল। এটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক। এসবের মধ্য দিয়ে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের জন-আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্যুতি ঘটে। আমার বিবেচনায় গণ-অভ্যুত্থানে যে অভূতপূর্ব ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিল, সেটাই যখন ন্যূনতম ধরে রাখা যায়নি, তখন গণ-অভ্যুত্থানের জন-আকাঙ্ক্ষা আর কতটা পূরণ হওয়া সম্ভব?
জাতীয় অর্থনীতি: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠান সংস্কারে কতটা প্রতিফলিত হতে দেখা যাচ্ছে?
অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী: আমি তেমন কিছু দেখছি না। কারণ গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তারা চব্বিশের চেতনাকে ধারণ করেনি। তারা বিশেষ কিছু এজেন্ডা নিয়ে এসেছিল। তাদের ব্যক্তিগত ও আন্তর্জাতিক এজেন্ডা ছিল । তারা তাদের সেসব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। সংস্কারের নামে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দীর্ঘদিন যমুনায় বসে হয়তো এফজিডি করেছে। কিন্তু তার ফলাফল শেষ পর্যন্ত কি? জুলাই সনদের নামে অনেক আলাপ আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যেটা গৃহীত হয়েছে সেটার প্রতি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট নিয়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল, সেই সরকার প্রথমেই সেই ম্যান্ডেট থেকে বেরিয়ে যায়। আমাদের সন্তানদের বুকে গুলি চালানোর বিরুদ্ধে যখন আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছি, তখন আমি আসলে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। গুম, খুন ও নিপীড়নমুক্ত একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম বাংলাদেশে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি হবে যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সব মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারবে। ড. ইউনূস কি আমাদের সেই নিরাপদ বাংলাদেশ দিতে পেরেছিল? পারেনি। ড. ইউনূসের সরকার মব সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দিয়েছে। মব সন্ত্রাসকে তারা প্রেসার গ্রুপ হিসেবে দেখিয়েছে। ড. ইউনূসের সময়ে একটি অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে আমরা একটি ভয়াবহ সংকটে পতিত হয়েছি। প্রায় ছয় মাস হলো একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে। কিন্তু মব সন্ত্রাসের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেখান থেকে কিন্তু আমরা এখনও পুরোপুরিভাবে বের হতে পারিনি। এখনও কিন্তু মব সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে অনেক মানুষ।
শেখ হাসিনার শাসনামলে অসংখ্য রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। আমাদের চাওয়া ছিল, গত ১৫ বছরে যতগুলো রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে প্রত্যেকটি ঘটনার বিচার হবে। প্রত্যেক দোষীকে শাস্তি দিতে হবে। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। কিন্তু সেটা হয়নি। জুলাই ম্যাসাকারের বিচার হয়নি। বরং মব সন্ত্রাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোনো নিপীড়ন বা অন্য কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয় এমন কাউকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শাস্তি প্রদানের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। এই দেশ ১৮ কোটি মানুষের দেশ। কোনো মানুষকে শুধু তার রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে শাস্তি দেওয়া যাবে না।
দেশে এখন একটা নির্বাচিত সরকার আছে, যা স্বস্তিদায়ক। এই সরকারের প্রতি আমার আস্থা আছে। সরকারের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা আছে। আশা করি, তিনি এ পরিস্থিতি থেকে দ্রুত উত্তরণের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবেন। তবে একথা বলতেই হবে যে, এখন পর্যন্ত মবের বিরুদ্ধে সরকারের বলিষ্ঠ ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। মনে রাখা দরকার, একটি সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে দেশের সব মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া।
জাতীয় অর্থনীতি: গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন ও প্রাণহানির ঘটনাগুলোর বিচার নিশ্চিত করতে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?
অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী: প্রথম কথা হচ্ছে, বিচার নিয়ে কালক্ষেপণ করা যাবে না বা রাজনীতি করা যাবে না। ড. ইউনূস সরকারের এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে তেমন কোনো বলিষ্ঠ ভূমিকা আমরা দেখিনি। গত ছয় মাসে বর্তমান সরকারও এই বিচারসংক্রান্ত তেমন কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের আন্তরিকতা থাকতে হবে। জুলাই গণহত্যার বিচার নিয়ে রাজনীতি করলে ইতিহাস ক্ষমা করবে না। জুলাই গণহত্যার পেছনে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় যতগুলো রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে তদন্ত সাপেক্ষে সেগুলোর বিচার করতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: রাজনৈতিক দলগুলো কি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বার্তা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে, নাকি তারা আবারও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেই ফিরে যাচ্ছে?
অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী: কথা-বার্তায় রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই উচ্চারণ করছে, জুলাইয়ের চেতনার কথা বলছে। কিন্তু জুলাইয়ের জন-আকাঙ্ক্ষা এ মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে বলে আমি মনে করি না। এ বিষয়ে পুরোনো যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে সেগুলোর কাছে থেকে আমার প্রত্যাশা বরাবরই খুব কম। আমি বরং প্রত্যাশা ও আগ্রহ নিয়ে তাকিয়েছিলাম ছাত্রদের প্রতি যাদের মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল। ছাত্ররা যখন একটা নতুন দল গঠন করে তখনও আমি আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু গত এক দেড় বছরে ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে আশান্বিত হওয়ার মতো তেমন কিছু পাইনি। তাদের মধ্যে নতুন কোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আমি দেখিনি। তারা মুখে নতুন কথা বললেও পুরোনো বন্দোবস্তের মাঝেই আছে। বরং রাজনীতির মাঠে তারা যেসব ভাষা প্রয়োগ করছে, সেগুলো একটি সুস্থ ধারার রাজনীতির জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে না। পুরোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হতে আমরা দেখেছি, প্রায় সব ধরনের অভিযোগ গত এক-দেড় বছরে ছাত্রদের রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও উত্থাপিত হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দুইদিন আগে গোপনে ড. ইউনূসের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি করেছে। এই চুক্তি নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার ও উৎকণ্ঠিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। এই চুক্তি করার আগে ইউনূস সরকার বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে হয়তো আলাপ করেছে। সে কারণেই হয়তো, দেশের কিছু সচেতন মানুষ বা কিছু বাম রাজনৈতিক সংগঠন যখন এই চুক্তি বাতিলের দাবি তুলছে, তখন বিএনপি ও জামায়াত এই বিষয়ে নীরবতা পালন করছে। ছাত্রদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও এ বিষয়ে নীরবতা পালন করছে। আমি মনে করি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে যারা রাজনীতি করবে তাদের হাতে আমাদের দেশ নিরাপদ নয়। ফলে এসব বিবেচনায় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন কিছু এখনও পেয়েছি বলে আমি মনে করছি না। আমরা এখনও পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও সংস্কৃতির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছি।
জাতীয় অর্থনীতি: অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কী প্রভাব পড়েছে?
অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ম্যোরালগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। দেশের ভিতরে মব সন্ত্রাসকে উসকে দেওয়া হয়েছে। এসব যখন ঘটবে তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মুখ ফিরিয়ে নেবে, এটাই স্বাভাবিক। সেটাই ঘটেছে। আমরা অর্থনৈতিকভাবে একটা চাপের মধ্যে আছি। চব্বিশ পরবর্তী সময়ে নতুন কোনো বিনিয়োগ এসেছে বলে শুনিনি। আমি মনে করি, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান নয়, গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অরাজক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা আমাদের দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
জাতীয় অর্থনীতি: ভবিষ্যতে যেন একই ধরনের রাজনৈতিক সংকট বা সহিংস পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেজন্য রাষ্ট্রের কোন কোন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সংস্কার জরুরি?
অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী: প্রথমত, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। সেখানে সরকারকেই প্রধান দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিরোধী দলকে দিয়ে গঠনমূলক ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রেও সরকারকে ভূমিকা রাখতে হয়। আমরা এখনও একটি নিরাপদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। কিছুদিন আগেও হবিগঞ্জে একটি ছেলে হামলার শিকার হয়ে একটি চোখ হারিয়েছে। এর পেছনে কারণ যাই থাকুক, এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। এসব ঘটনা যদি ঘটে তাহলে দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ খুব শান্তিপূর্ণ হবে না। সুতরাং সরকার ও বিরোধী দলে যারা আছেন তাদের প্রতি আমার প্রত্যাশা তারা গঠনমূলক রাজনীতি করবে, দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা হবে। সরকারের উচিত হবে দেশের মানুষকে প্রতিপক্ষ না বানানো। সরকারের কাজ হবে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটগুলো মোকাবিলা করা এবং একটি বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা।
অর্থনৈতিক বৈষম্য যদি দূর না করা যায়, মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে যদি স্বস্তি না আনা যায়, মানুষের সামাজিক জীবনে যদি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা না যায় তাহলে সংকটের সমাধান হবে না।
মানুষ চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি চেয়েছিল। কিন্তু আমি মনে করি না, চব্বিশে মানুষের মুক্তি মিলেছে। যারা মনে করছেন, চব্বিশ শেষ হয়ে গিয়েছে তারা ভুল করবেন। চব্বিশে মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির একটা দীর্ঘ লড়াইয়ের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। এখানে চব্বিশে যারা হিরো ছিল, তারা হয়তো হারিয়ে যাবে। নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে। যতদিন পর্যন্ত মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি না আসবে ততদিন পর্যন্ত লড়াইটা অব্যাহত থাকবে। ফলে হয় মানুষের মুক্তি আসবে নয়তো আরেকটা গণ-অভ্যুত্থান ঘটবে।