জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বদলে দিল রাজনৈতিক দর্শন

আখতার হোসেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও জাতীয় সংসদের রংপুর-৪ আসনের সদস্য। ছাত্রজীবনে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনসহ বিভিন্ন অধিকারভিত্তিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তিনি একাধিকবার কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হন। ছাত্র আন্দোলনের সেই অভিজ্ঞতা থেকেই গড়ে ওঠে তার রাজনৈতিক দর্শন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ‘জাতীয় অর্থনীতি’র  সিনিয়র সহ-সম্পাদক সানজিদ সকাল

জাতীয় অর্থনীতি: ছাত্র আন্দোলনের কর্মী থেকে আজ সংসদ সদস্য— এই দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে কঠিন সময় কোনটি ছিল? 

আখতার হোসেন: একজন ছাত্র সংসদের প্রতিনিধি থেকে জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ পাওয়াকে আমি সর্বপ্রথম মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করি। আলহামদুলিল্লাহ। পেছনে ফিরে তাকালে আমার কাছে মনে হয়, যেন সবকিছু খুব দ্রুত ঘটে গেছে। ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, আজ ২০২৬ সালে এসে সেই যাত্রা আমাকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। মাঝখানের কয়েকটি বছর কেটে গেলেও ঘটনাগুলো এখনও আমার কাছে খুবই জীবন্ত, যেন সেদিনেরই স্মৃতি।

আসলে রাজনীতিতে আমার প্রবেশটা প্রচলিত রাজনৈতিক ধারায় নয়; একজন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবেই আমার যাত্রা শুরু। আজও আমি নিজেকে একজন অ্যাক্টিভিস্ট পরিচয় দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। রাজনৈতিক জীবনের অনেক বিষয় এখনও শেখার আছে, রপ্ত করার আছে। তবে মানুষের অধিকার ও ন্যায়ের প্রশ্নে সোচ্চার হওয়ার মানসিকতাই আমাকে রাজনীতির পথে নিয়ে এসেছে।

২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হল থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়। চার হাত-পা ধরে আমাকে হল থেকে টেনে বের করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় হলের বাইরে থাকতে হয়েছে। জীবনের সেই সময়টি ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং সংগ্রামময়।

পরে প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাবিতে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেখানেও আমি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হই। সেই আন্দোলনের সময় আমি দল-মত নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের সমর্থন পেয়েছি। শুরুতে আন্দোলনে মানুষের অংশগ্রহণ খুব বেশি ছিল না; বিচ্ছিন্নভাবে শিক্ষার্থীরা যুক্ত হচ্ছিলেন। কিন্তু মাত্র দু’দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। শত শত শিক্ষার্থী রাজু ভাস্কর্যে সমবেত হন, আর আন্দোলনটি এক নতুন গতি লাভ করে।

এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি এবং সমাজসেবা সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করি। সে সময় ডাকসুর মোট ২৫টি পদের মধ্যে ছাত্রলীগের বাইরে থাকা প্রার্থীরা মাত্র দুটি পদে বিজয়ী হয়েছিলেন— একটি ছিল ভিপি পদ এবং অন্যটি সমাজসেবা সম্পাদক পদ, যেখানে আমি নির্বাচিত হই। বাকি ২৩টি পদেই ছাত্রলীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন।

এই পুরো যাত্রাপথ আমাকে শিখিয়েছে— সংগ্রাম, ত্যাগ ও মানুষের আস্থা থাকলে অসম্ভব বলেও কিছু থাকে না। একজন ছাত্রনেতা ও অধিকারকর্মী থেকে আজ জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি হওয়ার পথটি আমার কাছে কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি সেই সব মানুষের বিশ্বাস ও সমর্থনের প্রতিফলন, যারা শুরু থেকেই আমার পাশে ছিলেন।

জাতীয় অর্থনীতি: রাজনীতিতে আসার পেছনে ব্যক্তিগত কোনো ঘটনা বা অনুপ্রেরণা কি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে?

আখতার হোসেন: আমি আসলে ছোটবেলা থেকেই একটু ডানপিটে স্বভাবের ছিলাম। খেলাধুলা করতে খুব ভালো লাগত। যদিও খেলাধুলায় খুব পারদর্শী ছিলাম না, তবু সব সময় অংশ নিতাম। তখন থেকেই আমাদের পাড়ার সমবয়সি ছেলেদের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার একটি প্রবণতা আমার মধ্যে গড়ে উঠেছিল। শুরু থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল লেখাপড়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে আইন পেশায় যুক্ত হব। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও আমার লক্ষ্য ছিল আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তোলা। 

আইনের ছাত্র হিসেবে বিভিন্ন অধিকারবিষয়ক বিষয় সম্পর্কে জানতে শুরু করি। বিশেষ করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন সম্পর্কে জানার পর এসব বিষয়ে আমার আগ্রহ আরও বাড়ে। কোথাও খাদ্যে ভেজাল, কোথাও কোনো পণ্যের অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে— এ ধরনের ঘটনা চোখে পড়লেই আমি প্রতিবাদ করতাম। বিষয়গুলো হয়তো খুব বড় ছিল না, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এই মানসিকতা আমার চরিত্রে অনেক আগে থেকেই ছিল।

ছাত্রজীবন থেকেই আমি মূলত একজন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলতাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতাম। সহজে ভয় পাওয়ার মানুষ আমি কখনই ছিলাম না। তবে তখনও রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আমার ছিল না। আমি বিশ্বাস করতাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।

আমাকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মধ্যে কাটাতে হয়েছে। কখনও কোনো বন্ধুর মেসে, কখনও অন্য কোথাও আশ্রয় নিয়েছি। একপর্যায়ে ঢাকা কলেজে আশ্রয় নিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানেও ছাত্রলীগের তাড়া খেয়ে বের হয়ে আসতে হয়। সব মিলিয়ে জীবনের সেই সময়টা ছিল অত্যন্ত অনিশ্চিত, অস্থির এবং কঠিন এক অধ্যায়।

জাতীয় অর্থনীতি: আন্দোলনের সময় কারা বন্দি হওয়া, হামলা বা মামলার মতো অভিজ্ঞতা আপনার রাজনৈতিক দর্শনকে কীভাবে বদলেছে?

আখতার হোসেন: ক্যাম্পাস জীবনে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে আমাকে বহুবার নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। এমন অনেক ঘটনা আছে, যেগুলো সেই সময় কাউকে বলারও সুযোগ কিংবা সাহস পাইনি। একটি ঘটনার কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে। ঢাবির শেখ মুজিব হলের একজন শিক্ষার্থী ডেঙ্গুতে মারা যান। তার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আনার কথা ছিল। আমিও সেই লাশবাহী গাড়িতে ছিলাম। কিন্তু পান্থপথে এসে ছাত্রলীগের কয়েকজন সদস্য হঠাৎ গাড়ির গতিপথ পরিবর্তন করে। লাশটি আর ক্যাম্পাসে নেওয়া হয়নি; অন্য একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। চারপাশে ছাত্রলীগের ছেলেরা। আমার সঙ্গে ছিল আমার বন্ধু মোল্লা শুভ্র। সে আমাকে না মারার জন্য বারবার অনুরোধ করছিল। কিন্তু তার সেই অনুরোধও উপেক্ষিত হয়। তাকেও মারধর করা হয়, আমাকেও নির্মমভাবে মারধর করা হয়। আমি রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলাম। এমন অসংখ্য ঘটনা আছে, যেগুলো আমি আজ পর্যন্ত কোথাও বলতে পারিনি।

জাতীয় অর্থনীতি: জুলাই গণ-অভ্যুত্থাণে অনেক নারী নেতত্ব দিয়ে আন্দোলনের সম্মুখভাগে ছিল। এখন তারা কেন হারিয়ে গেল এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাই।

আখতার হোসেন: আমাদের মতো দেশে নারীদের জন্য রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা এখনও পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নারীদের যে অংশগ্রহণ আমরা দেখেছি, তা নিঃসন্দেহে অভূতপূর্ব। বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে এত বড় পরিসরে, এত সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের মানসিকতা নিয়ে নারীদের অংশগ্রহণ খুব কমই দেখা গেছে।

প্রথমদিকে আমরা দেখেছি, নারী শিক্ষার্থীরা সাহসিকতার সঙ্গে রাজপথে নেমে এসেছেন। পরবর্তী সময়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন আমাদের মায়ের বয়সি অসংখ্য নারীও। এটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দৃশ্য। আমার বিশ্বাস, মানুষের ওপর অব্যাহত নির্যাতন, রক্তপাত ও প্রাণহানির ঘটনা তাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। মাতৃত্বের অনুভূতি থেকেই তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। তাদের সাহসিকতার অসংখ্য দৃশ্য আজও আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস। আন্দোলনের একটি পর্যায়ে আমি কারাগারে ছিলাম। পরে মুক্ত হয়ে নারীদের অংশগ্রহণের অনেক ভিডিও ও ঘটনা দেখেছি, যা আমার কাছে আজীবনের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি রাজপথে নারীদের উপস্থিতি ক্রমে কমে যেতে থাকে। তারা ধীরে ধীরে জনপরিসর থেকে সরে গিয়ে আবার ঘরে ফিরে যেতে শুরু করেন। এর পেছনে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, আমরা এখনও এমন একটি উপযুক্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি, যেখানে নারীরা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারবেন। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে নারীদের সমান অংশীদার করতে চাই, তাহলে তাদের সাহস জোগাতে হবে এবং এমন একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে তারা নিজেদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মূল্যায়িত মনে করবেন।

জাতীয় অর্থনীতি: বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির উত্থানকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আখতার হোসেন: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেকেই এই বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক বা ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান ঘটেছে। তবে আমার মতে, বাস্তবতাকে বুঝতে হলে বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চরিত্রকে বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ স্বভাবগতভাবেই ধর্মভীরু। তারা নিজ নিজ ধর্ম পালন করেন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা করেন। কিন্তু সেটি এই অর্থে নয় যে রাষ্ট্রকাঠামো ধর্মীয়করণ বা ইসলামায়নের পথে চলে গেছে। বাস্তবে রাষ্ট্রের প্রচলিত সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কাঠামোই বহাল রয়েছে; রাষ্ট্রব্যবস্থায় মৌলিক কোনো ধর্মীয় রূপান্তর ঘটেছে— এমনটি বলা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

এমন একটি রাজনীতি, যেখানে ধর্ম থাকবে সম্মান ও মূল্যবোধের জায়গায়; যেখানে মানুষ নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবে এবং ধর্ম পালনের কারণে কাউকে নিপীড়নের শিকার হতে হবে না। একইসঙ্গে ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করা হবে না এবং ধর্মকে রাজনৈতিক উগ্রবাদ বা বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হবে না।

২০২৪ সালের আগে ধর্মপ্রাণ মানুষের একটি অংশ বিভিন্নভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য কিংবা নিপীড়নের অভিযোগ অনুভব করতেন। অভ্যুত্থানের পর সেই পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু এই পরিবর্তনকে যদি কেউ সরলীকৃতভাবে ‘ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, তাহলে সেটি বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন হবে না। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ কোনো চরমপন্থায় নয়, বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যমপন্থি রাজনীতিতে আস্থা রাখেন। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চান, যেখানে রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের ওপর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিপীড়ন বা বৈষম্য করবে না, আবার ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশীলনের প্রতিও যথাযথ সম্মান দেখাবে। 

জাতীয় অর্থনীতি: এক বছরের বেশি সময় পর এনসিপি তার সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনটিকে মনে করে, আর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কোনটি?

আখতার হোসেন: বাংলাদেশের জন্য এর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো একটি দীর্ঘ দমন-পীড়নের শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্তি। আমরা এমন একটি সময় অতিক্রম করেছি, যখন মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হতো, গুম করা হতো; ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ ছিল না, বাকস্বাধীনতা কার্যত অনুপস্থিত ছিল। মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে একের পর এক দলীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়েছিল। এমন একটি দুঃশাসন থেকে মুক্তি লাভ নিঃসন্দেহে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

তবে ইতিহাসের প্রতিটি বিপ্লব, গণ-অভ্যুত্থান কিংবা মুক্তির সংগ্রামের মতো জুলাই অভ্যুত্থানও মানুষের মনে বিশাল প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। এটি খুবই স্বাভাবিক। মানুষ যখন অন্যায়, অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তখন তারা এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজের স্বপ্ন দেখে, যেখানে আর কোনো অন্যায়ের স্থান থাকবে না; যেখানে নিপীড়ন, বৈষম্য কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার থাকবে না; যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার সাংবিধানিক অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিতভাবে ভোগ করতে পারবে।

জুলাই অভ্যুত্থানকে ঘিরে আমাদেরও সেই প্রত্যাশা ছিল। সেই প্রত্যাশার সবটুকু এখনও বাস্তবায়িত হয়নি— এ কথা স্বীকার করতেই হবে। রাষ্ট্র সংস্কার, প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পথে এখনও অনেক কাজ বাকি।

জাতীয় অর্থনীতি: জুলাই আন্দোলনে শহিদ ও আহত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কতটা সফল হয়েছে? 

আখতার হোসেন: আসলে আমরা যখন আন্দোলনে নেমেছিলাম, তখন শুধু সরকার পরিবর্তনের কথা ভাবিনি; আমাদের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন। আমরা এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে চেয়েছিলাম, যেখানে নাগরিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। সেই জায়গা থেকেই আমি মনে করি, এই অভ্যুত্থানকে ঘিরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দায়িত্ব রয়েছে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে যারা শহিদ হয়েছেন এবং যারা আহত বা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। যারা জীবন দিয়েছেন, তারা ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থে নয়; দেশের মানুষ ও রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেননি। অনেক শহিদের পরিবারে তিনি ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুর পর সেই পরিবারগুলো আজ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাই তাদের পুনর্বাসন, আর্থিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

একইভাবে আহতদের চিকিৎসার বিষয়টিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। এখনও অনেক আহত ব্যক্তি আছেন, যারা উন্নত চিকিৎসা পেলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। আবার শত শত মানুষ আছেন, যারা দুই চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন। তাদের অধিকাংশই তরুণ; জীবনের বড় একটি সময় এখনও তাদের সামনে পড়ে আছে। যদি সরকার আধুনিক চিকিৎসা, উন্নত প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা অনুসন্ধানে বড় উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে তাদের অনেকের জীবন নতুন করে আলোর মুখ দেখতে পারে। এই প্রচেষ্টা শুধু চিকিৎসা নয়, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত সম্মানও হবে।

এই বীরত্বগাথা, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ পরবর্তী প্রজন্ম যদি এই ইতিহাস না জানে, তাহলে তারা কোথা থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা পাবে? তারা কোথা থেকে সাহস অর্জন করবে? একইসঙ্গে যারা ভবিষ্যতে স্বৈরতান্ত্রিক বা ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখবে, তাদের জন্যও এই ইতিহাস একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে— এই ভূখণ্ডের মানুষ অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না।