আজ ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট। ঠিক দুই বছর আগে ২০২৪ সালের এই বিশেষ দিনে নজিরবিহীন ও রক্তস্নাত ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে একছত্র ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর তাঁর পদত্যাগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন ভোরের সূচনা করেছিল।
রক্তস্নাত সেই অভ্যুথানের ধারাবাহিকতায় দেশে আবারও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জনগণের শাসন। মুক্ত ও অবাধ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় আসীন হয়েছে। আজ দুই বছর পর দাঁড়িয়ে পুরো জাতি গভীর শ্রদ্ধা ও শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করছে জুলাই-আগস্টের সেই বীর শহীদ ও আহত আন্দোলনকারীদের, যাদের অসীম আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বৈরাচারের লৌহকপাট ভেঙে মুক্ত হয়েছিল বাংলাদেশ।
কিন্তু কীভাবে শুরু হয়েছিল এই মহাকাব্যিক পরিবর্তন?
২০২৪ সালের ১ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ চাকরিপ্রত্যাশী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে এই বিপ্লবের সূচনা ঘটে। ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথ ও রেলপথ অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সরকার তাতে বিন্দুমাত্র সাড়া দেয়নি।
১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক অবমাননাকর বক্তব্যের জের ধরে মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরণ ঘটে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে এসে স্লোগান তোলেন- ‘তুমি কে আমি কে- রাজাকার রাজাকার; কে বলেছে কে বলেছে- স্বৈরাচার স্বৈরাচার’।
পরদিন ১৫ জুলাই ক্ষমতাসীন দলের উসকানিমূলক ইঙ্গিতের পরপরই ছাত্রলীগের তাণ্ডবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নেমে আসে নারকীয় সহিংসতা। অস্ত্র হাতে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মম হামলা চালানো হয়। তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিকার ভূমিকার মধ্যে সেদিন ৩০০-র বেশি মানুষ আহত হন। ১৭ জুলাই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সব হল থেকে ছাত্রলীগকে বের করে দিয়ে ক্যাম্পাসগুলোকে ‘রাজনীতিমুক্ত’ ঘোষণা করেন।
১৮ জুলাই থেকে শুরু হয় দেশব্যাপী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’। ওই দিন অন্তত ৪১ জন নিহত হন এবং সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বন্ধ করে বহির্বিশ্ব থেকে দেশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। ১৯ জুলাই দ্বিতীয় দিনের সংঘর্ষে আরও অন্তত ৫৬ জন প্রাণ হারান এবং ২০ জুলাই গভীর রাত থেকে দেশজুড়ে জারি করা হয় কঠোর কারফিউ। ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ ছাত্রদের বাঁচাতে বুলেটের মুখে রাজপথে নেমে এলে আন্দোলন পূর্ণাঙ্গ গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিনে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে রাজধানীতে। কারফিউ ভেঙে বেলা দেড়টার দিকে খবর আসে- জনতার তীব্র প্রতিরোধের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।
শেখ হাসিনার পলায়নের পর উল্লসিত জনতা গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনে ঢুকে পড়ে। রাজপথে নেমে আসে কোটি মানুষের মুক্তির আনন্দ।
উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তৎকালীন সেনাপ্রধান সেনা সদর দপ্তরে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ শীর্ষ রাজনৈতিক দলের নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে সেনাপ্রধান জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। এখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে।’
৫ আগস্ট রাতেই বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সভাপতিত্বে এক ঐতিহাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনতিবিলম্বে সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং দীর্ঘদিনের সাজানো ও মিথ্যা মামলায় বন্দি থাকা আপসহীন দেশনেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তির আদেশ দেওয়া হয়।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলের পতন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন ভোরের সূচনা করেছিল। সেই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনা এবং পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত অবাধ নির্বাচনে জনগণের বিপুল রায়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। আজকের এই দিনে বিএনপি সরকার গণ-অভ্যুত্থানের সব শহীদকে ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে। স্বৈরাচার উপড়ে ফেলে দেশে গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার রক্ত দিয়ে তৈরি হয়েছিল, আজ সেটাই দেশের মূলভিত্তি।
