আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির মূল চালিকাশক্তি পেট্রোলিয়াম বা জ্বালানি তেল। গত ৪০ বছরের মধ্যে এই জ্বালানির সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে আমেরিকা।
টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে তেলের মজুদ কমতে কমতে ১৯৮৩ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুদ বা 'স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ' (এসপিআর)।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক সপ্তাহেই তাদের ভাণ্ডার থেকে আরও ৫১ লাখ ব্যারেল তেল খালি হয়ে গেছে। বর্তমানে দেশটির কৌশলগত তেলের মোট মজুদ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩১ কোটি ১৪ লাখ ব্যারেলে।
এর আগের সপ্তাহেও প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল তেল তুলে নেওয়া হয়েছিল, যা স্পষ্ট করে দিচ্ছে মার্কিন প্রশাসন এখন কতটা বড় কৌশলগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ কেন আমেরিকান তেলের ভাণ্ডারে এই ধস? এর উত্তর লুকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতিতে।
গত মে মাসের শেষ দিকে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করার পর থেকেই আমেরিকান তেলের মজুদ দ্রুত ফাঁকা হতে শুরু করে। সেই সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মজুদ থেকে ১০ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেল বাজারে ছাড়তে বাধ্য হয়েছে ওয়াশিংটন।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম সহনীয় রাখতে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক জরুরি তেল ছাড় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সবমিলিয়ে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল ছাড়ার এক বিশাল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে মার্কিন প্রশাসন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার ফলে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ 'হরমুজ প্রণালি' দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যেন বড় ধরনের কোনো হাহাকার বা রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি না ঘটে, সে উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় রেখে যুক্তরাষ্ট্র একে পর এক তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগ ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে যে, তারা এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল ছাড়ের অনুমোদন সম্পন্ন করেছে।
শুধু যে কৌশলগত মজুদ কমেছে তা নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক তেল ভাণ্ডারের অবস্থাও বেশ করুণ।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক এবং কৌশলগত- এই দুই ক্ষেত্র মিলিয়ে মোট তেলের মজুদ গিয়ে ঠেকেছে ৭২ কোটি ৬২ লাখ ব্যারেলে। সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংখ্যাটি বড় মনে হলেও আমেরিকার মতো বিশাল ব্যবহারকারী দেশের জন্য ১৯৮৪ সালের পর এটিই সর্বনিম্ন পেট্রোলিয়াম মজুদ।
খুব শীঘ্রই পরবর্তী হালনাগাদ তথ্য আসা বাকি রয়েছে, যা পরিস্থিতি আরও কতটা জটিল তা পরিষ্কার করবে।
১৯৭০-এর দশকের বৈশ্বিক তেল সংকট ও চরম অর্থনৈতিক ধাক্কার পর আমেরিকা এই স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ গড়ে তুলেছিল। মূলত মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূলের ভূগর্ভস্থ বিশাল প্রাকৃতিক লবণ গুহাগুলোতে এই তেল অত্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়, যার সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা প্রায় ৭১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল। কিন্তু সেই ৭২ কোটি ক্যাপাসিটির জায়গায় আজ তেলের মজুদ নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেক স্তরে।
ভূ-রাজনৈতিক এই টানাটানি আর কত দিন চলবে এবং আমেরিকা কীভাবে তাদের এই কৌশলগত শূন্যতা পূরণ করবে- তা এখন পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বড় প্রশ্ন!