লালমনিরহাট প্রতিনিধি: লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় প্রশাসনের তদারকির অভাবে সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ফলে উপজেলার অধিকাংশ হাট-বাজার এখন বসছে ঈদগাহ মাঠ, ভাড়া করা জমি ও সড়কের ধারে। এতে একদিকে যেমন সাধারণ ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আদায়ে দেখা দিয়েছে চরম মন্দা।
জানা গেছে, আদিতমারী উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে প্রায় অর্ধশত হাট ও বাজার বার্ষিক ইজারার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে সরকার। নিয়ম অনুযায়ী ইজারার অর্থের একটি অংশ দিয়ে হাট-বাজারের উন্নয়ন করার কথা থাকলেও তা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে অধিকাংশ হাটের সরকারি জমি প্রভাবশালীরা দখল করে ৪/৫টি করে দোকান ও গুদাম ঘর তৈরি করে মোটা অঙ্কের জামানত ও মাসিক ভাড়ায় উপ-ভাড়া দিচ্ছে। এমনকি হাট-বাজারের ড্রেন, টিউবওয়েল ও বাথরুমও দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। পানি ও বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বাজারগুলোতে ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে দমবন্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই হাঁটু কাদা মাড়িয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের বাজারে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
সরকারি জমি বেদখল হওয়ায় ইজারাদাররা বাধ্য হয়ে ঈদগাহ মাঠ বা সড়কের পাশে হাট বসাচ্ছেন। ঐতিহ্যবাহী ‘বুড়িরহাট’ ১৭ লাখ ৪০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সাইফুজ্জামান ফারুক। তিনি জানান, হাটের মূল জায়গা দখল করে অবৈধ মার্কেট ও মুরগির খামার গড়ে ওঠায় অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ঈদগাহ মাঠ ভাড়া নিয়ে সবজি বাজার বসাতে হয়েছে।
একই চিত্র নামুড়ি হাটেও। প্রায় ১২ লাখ টাকায় হাটটি ইজারা নেওয়া শাহীন মিয়া জানান, ড্রেন ভরাট করে ভবন নির্মাণ করায় কৃষকরা তাদের পণ্য বিক্রির জায়গা পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে তারা লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের ধারে বসছেন, যা যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। জায়গা না পেয়ে সবজি চাষি আফসার উদ্দিন বলেন, "সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে নামমাত্র মূল্যে পাইকারদের কাছে লাউ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি, তাও আবার ৫০ টাকা খাজনা দিতে হয়েছে। আমরা নিরাপত্তা ও সম্মানের সাথে পণ্য বিক্রির পরিবেশ চাই।"
প্রশাসনের নজরদারির অভাবে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘কুষ্টারীর হাট’ দীর্ঘ দুই বছর ধরে বার্ষিক ইজারা হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর থেকে এই হাট খাস কালেকশনের নামে নামমাত্র টাকা জমা দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। অথচ একসময় এই হাট থেকে সরকারের সর্বোচ্চ প্রায় অর্ধকোটি টাকা রাজস্ব আসত, যা এখন ১০ লাখ টাকাও পার হচ্ছে না। এছাড়া দুর্গাপুরের হাটে মুদি ব্যবসায়ীদের সরকারি শেড ঘর দখল করে গড়ে উঠেছে হোটেল ব্যবসা, যার চুলার ধোঁয়ায় সরকারি টিন নষ্ট হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে।
ক্ষতির মুখে পড়ে অনেক ইজারাদার এখন আর হাট ইজারা নিতে চাচ্ছেন না। ফলে উপজেলা প্রশাসনকে অনেকটা ডেকে এনে হাট ইজারা দিতে হচ্ছে। নামুড়ি হাটের ইজারাদার শাহীন মিয়া অভিযোগ করেন, "দখলদারদের তালিকা দিয়েও ৪ মাসে শুধু তদন্তই হলো, উচ্ছেদ হলো না। লোকমুখে শুনছি দখলদাররা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেছে।"
তবে এ বিষয়ে আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি গুঞ্জন বিশ্বাস বলেন, "ইজারাদারের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে নামুড়ির হাটের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে জেলা প্রশাসনের অনুমতির জন্য আবেদন পাঠানো হয়েছে। অনুমতি পেলে দ্রুত কার্যকর করা হবে। পর্যায়ক্রমে সকল হাট-বাজারে অভিযান চালিয়ে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।"
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
