অবৈধ বালু লুটে বিলীন হওয়ার পথে জকিগঞ্জ-কানাইঘাটের ২৫ গ্রাম
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

সিলেট প্রতিনিধি: বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। ফলে নদী তীর, কৃষি জমি, ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সিলেটের জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলা এবং সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের যাদুকাটা নদীতে অবৈধভাবে বালু তোলার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। ইজারাদারদের এমন নির্মমতায় স্থানীয়দের বসতভিটা, বাঁশবাগান, বৃক্ষরাজি ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে শত শত পরিবার। পরিবেশ ধ্বংসকারী ‘বোমা মেশিন’ ও ‘সেফ মেশিন’ লাগিয়ে নির্বিচারে এই বালু উত্তোলন চললেও প্রশাসন কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করছে।

বালু খেকোদের আগ্রাসনে সিলেটের জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটের সুরমা নদীর তীরবর্তী অন্তত ২৫টিরও বেশি গ্রাম এখন তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে। জকিগঞ্জের শরিফাবাদ, কোনাগ্রাম, নয়াগ্রাম, চক গ্রাম, বুরহানপুর, বারইগ্রাম, ফইল গ্রাম, দিঘীরপার, কাকুরা, সিঙ্গারপার, গোলাঘাট, দত্তগ্রাম, গোদার বাজার ও ডালাহানি গ্রাম এবং কানাইঘাটের ভাটজি গ্রাম, উমরগঞ্জ, বাঘার বাজার, দক্ষিণ বড়দেশ, কাইস্থগ্রাম, চন্দ্রপুর, চলিতাবাড়ী, পাত্র ও ঝিঙ্গাবাড়ী এলাকা এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতিমধ্যে ভাঙনের মুখে পড়ে কানাইঘাট ও তাহিরপুরের ঘাগটিয়া গ্রামের অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। এছাড়া সুনামগঞ্জের বিখ্যাত পর্যটন স্পট যাদুকাটা নদী তীর ও শিমুল বাগানও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

জকিগঞ্জের শাহগলির চক গ্রামের স্বল্প আয়ের বাসিন্দা মারুফ জানান, তার শেষ সম্বল বসতভিটাটুকুও সুরমা নদীতে বিলীন হতে চলেছে। তার এই আহাজারির ভিডিও দেশ-বিদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলেও মেলেনি কোনো প্রতিকার। উল্টো অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা তাকে প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। মারুফ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অনেকেই এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু স্ত্রী ও ছোট তিন বাচ্চা নিয়ে আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।”

স্থানীয়রা জানান, পরিবেশ ধ্বংসকারী ৪টি হাইড্রোলিক ড্রেজার দিয়ে ২০-২২টি বড় বড় স্টিল বডি নৌকায় দৈনিক অন্তত ৮০ লক্ষ টাকার বালু লুট করা হচ্ছে। এর ফলে এলাকার ‘সবজি গ্রাম সমবায় সমিতি’র কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানির পাইপলাইন, ২ কোটি টাকার মসজিদ, স্কুল, হাটবাজার ও ফসলি জমি এখন ধসের মুখে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জকিগঞ্জ নয়াগ্রাম এলাকার সুরমা নদীর দক্ষিণ অংশের একটি বালু মহাল জনৈক ব্যক্তি ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় ইজারা নেন। কিন্তু ইজারাদারের লোকজন নির্ধারিত সীমানা অমান্য করে ইজারা বহির্ভূত কানাইঘাটের কায়স্থগ্রামসহ আশেপাশের এলাকা থেকে দৈনিক কোটি টাকার বালু হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের চোখ ফাঁকি দিতে তারা বেছে নিয়েছে ভিন্ন কৌশল। প্রতিদিন ভোর ৩টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ইজারা বহির্ভূত জায়গায় ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হয় এবং দিনের বেলা কাজ বন্ধ রেখে তারা চুপচাপ বসে থাকে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে ও প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী গ্রামবাসী বুধবার সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর একটি লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন। একই সাথে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী, পানি সম্পদ মন্ত্রী, বন ও পরিবেশ মন্ত্রী, নৌপরিবহন মন্ত্রী এবং ভূমি মন্ত্রীসহ ৫ জন মন্ত্রীকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।

এর আগে গত ৩০ জুলাই জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে জানানো হলে তিনি সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর উপজেলা প্রশাসন 'লাল পতাকা' টানিয়ে ইজারাকৃত ভূমি চিহ্নিত করে ইজারাদারকে সতর্ক করলেও বালু খোরচক্রের তাণ্ডব থামেনি।

এ বিষয়ে জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুজিত কুমার চন্দ্র বলেন, “অফিস থেকে লোক পাঠিয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছে, ইজারাকৃত জায়গা থেকেই বালু তোলা হচ্ছে।” তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে জকিগঞ্জ অংশের বালু উত্তোলনের কারণে কানাইঘাট অংশে তীব্র ভাঙন দেখা দিলেও কানাইঘাটের ইউএনও মেহদী হাসান শাকিল জানান, জকিগঞ্জে বালু উত্তোলনের বিষয়টি ওই উপজেলার এখতিয়ারাধীন, তবে তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। কানাইঘাটের বাণীগ্রাম ইউপির বাসিন্দা ও স্থানীয়রা জানান, সুরমা নদীর দুই তীরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধও এখন বিলীনের পথে।

সার্বিক বিষয়ে সিলেটের নবাগত জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমরা অভিযোগ পেয়েছি। কোনো ধরনের অবৈধ কার্যক্রম বরদাশত করা হবে না। নদী ও পরিবেশ রক্ষায় শিগগিরই এসব চক্রের বিরুদ্ধে টাস্কফোর্স নামিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে।”

—জা. অর্থনীতি/এলএটি