অনলাইন ডেস্ক: বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে যুক্ত কয়েকটি বিধান অবৈধ ঘোষণার বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এর ফলে সংবিধানে গণভোটের বিধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ এ রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল খারিজ করে সর্বোচ্চ আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিটকারীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
রায় ঘোষণার পর আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির এটিকে ঐতিহাসিক রায় হিসেবে উল্লেখ করেন।
এর আগে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের নির্দেশ দেন আদালত। তবে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি।
হাইকোর্টের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেছিলেন। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হয়। আদালত বলেন, এসব বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামো-গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত সংবিধানের ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদও বাতিল ঘোষণা করা হয়।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান বাদ দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্ট এ বিধান বাতিলকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ উল্লেখ করে পঞ্চদশ সংশোধনীর ৪৭ ধারা বাতিল ঘোষণা করেন। এর ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে থাকা সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের আগের বিধান পুনর্বহাল হয়।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গণতন্ত্র সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্যতম অংশ। আর গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে।
আদালত আরও বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিগত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাস হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি, সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৪৫ থেকে ৫০-এ উন্নীত করাসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে মোট ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিবর্তন ও সংশোধন আনা হয়েছিল। তবে হাইকোর্টের রায়ে পুরো সংশোধনী বাতিল করা হয়নি। আদালত বলেছেন, অবশিষ্ট বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ জাতীয় সংসদ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী সংশোধন, পরিমার্জন বা পরিবর্তন করতে পারবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৩ নভেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করা হয়। পরে ১৩ নভেম্বর আপিল বিভাগের অনুমতি পাওয়ার পর শুনানি শুরু হয়। টানা তিন দিন শুনানি শেষে ৯ জুলাই রায়ের দিন নির্ধারণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে আপিল খারিজ করে দেন।
জা.অর্থনীতি/এসআই