চায়ের বৈচিত্র্যের স্বল্পতা এবং উৎপাদন বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের চা শিল্প বর্তমানে উৎপাদন বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মতো নানা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। এই শিল্পের নীতিনির্ধারণ, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ চা বোর্ড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ, এসপিপি, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি। দীর্ঘ সামরিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি দেশের চা শিল্পকে আধুনিকায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে কাজ করছেন। জাতীয় চা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের চা শিল্পের বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন জাতীয় অর্থনীতির সিনিয়র রিপোর্টার সাইদুর রহমান।

 

জাতীয় অর্থনীতি: ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের চা শিল্পের সামগ্রিক অবস্থান আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: ২০২৬ সালের চায়ের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১০৪ মিলিয়ন কেজি। এপ্রিল পর্যন্ত পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। চা উৎপাদনের জন্য অনুকূল পরিবেশ বিরাজমান রয়েছে। এছাড়াও চা বাগানগুলোয় প্রুলিং ও সঠিক সময়ে সার প্রয়োগ ও অন্যান্য পরিচর্যা করার জন্য বাংলাদেশ চা বোর্ড হতে সুপারিশ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান বিটিআরআই এবং পিডিইউর কর্মকর্তারা চা বাগানগুলো মনিটরিং করে পরামর্শ প্রধান  করছেন। অন্যদিকে ২০২৬ সালে চায়ের নিলাম মূল্য ভালো। অতএব, আশা করছি ২০০৬ সালে আমরা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব এবং সামগ্রিকভাবে চা শিল্প অনেক ভালো করবে।

জাতীয় অর্থনীতি: ২০২৩ সালের রেকর্ড উৎপাদনের পর পরবর্তী বছরগুলোয় সেই ধারা ধরে রাখা যায়নি। এর প্রধান কারণ কী?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: চা একটি জলবায়ুনির্ভর ফসল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দেশের অধিকাংশ চা বাগান দীর্ঘমেয়াদি খরার সম্মুখীন হয় যা চা উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া পোকামাকড় ও রোগবালাইর আক্রমণ, অপ্রতুল বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রার অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং কিছু এলাকায় পানি নিষ্কাশন সমস্যার কারণেও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে ২০২৩ সালের রেকর্ড উৎপাদনের ধারা পরবর্তী বছরগুলোয় বজায় রাখা সম্ভব হয়নি।

জাতীয় অর্থনীতি: ২০২৬ সালের জন্য ১০৪ মিলিয়ন কেজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত? এ লক্ষ্য অর্জনে কোন বিষয়গুলোয় সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: ২০২৬ সালের জন্য ১০৪ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। এ জন্য কয়েকটি বিষয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রথমত, পুরোনো ও অনুৎপাদনশীল চা গাছ পর্যায়ক্রমে পুনঃরোপণ করতে হবে। সাধারণত ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সি গাছ সর্বোচ্চ ফলন দেয় কিন্তু ৫০ বছরের বেশি বয়সি গাছের উৎপাদনক্ষমতা দ্রুত কমে যায়। তাই পুনঃরোপণ ও শূন্যতা পূরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, উচ্চ ফলনশীল ও মানসম্পন্ন জাতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বর্তমানে দেশের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও তুলনামূলক কম উৎপাদনশীল পুরোনো বীজজাতের ওপর নির্ভরশীল। বিটিআরআই উদ্ভাবিত ক্লোন ও উন্নত বীজজাত সম্প্রসারণ উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তৃতীয়ত, মাটি ও আবহাওয়া ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে। মাটির উর্বরতা, পানি নিষ্কাশন, মৃত্তিকার আর্দ্রতা সংরক্ষণ এবং সঠিক ছায়া ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা জোরদার করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, আধুনিক মাঠ ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে। সুষম সার প্রয়োগ, রোগপোকা দমন, শূন্যতা পূরণ, মালচিং এবং মৃত্তিকার আর্দ্রতা সংরক্ষণ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) অনুসরণ করলে ফলন ক্ষতি কমানো সম্ভব।

পঞ্চমত, পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। জলাবদ্ধতা চা গাছের শিকড়ের জন্য ক্ষতিকর আবার খরার সময় সেচ সুবিধা না থাকলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়। তাই কার্যকর ড্রেনেজ ও সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে, সঠিক চয়ন পদ্ধতি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় (৭ দিন) অন্তর কচি পাতা সংগ্রহের মাধ্যমে উৎপাদন ও গুণগতমান উভয়ই বৃদ্ধি করা সম্ভব। পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তি ও গবেষণালব্ধ সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে জাতীয় উৎপাদন টেকসইভাবে বৃদ্ধি পাবে।

জাতীয় অর্থনীতি: বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাহিদা কি চা রপ্তানির বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশে দিন দিন চায়ের উৎপাদন বাড়ছে। সেই সঙ্গে দেশের মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের সক্ষমতাও বাড়ছে। দুই দশক আগে দেশে ৫৫ থেকে ৬০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হতো। সেই সময় উৎপাদিত চায়ের অনেকাংশ বিদেশে রপ্তানি হতো। বর্তমানে বছরে ৯০ থেকে ১০০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদিত হলেও শতকরা ৯৫ ভাগেরও বেশি দেশের চাহিদা পূরণে ব্যবহার হচ্ছে। দশের চাহিদা পূরণের পর যৎসামান্য অবশিষ্ট চা বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। ফলে বিদেশ হতে চা আমদানির প্রয়োজন পড়ছে না। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাহিদা মূল বাধা নয়, মূল বাধা আমাদের উৎপাদন খরচ আন্তর্জাতিক বাজারে আনুপাতিক হারে বেশি এবং বৈচিত্র্যের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম রয়েছে।

জাতীয় অর্থনীতি: উচ্চ উৎপাদন সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনও কেন মূলত ডোমেস্টিক মার্কেটনির্ভর চা অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: চা শ্রমিক, বাগান মালিক, চা চাষিসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রচেষ্টায় চায়ের উৎপাদন গত দুই দশকে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই হারে দেশের অভ্যন্তরীণ চায়ের বাজারের পরিধিও বেড়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের সক্ষমতা যেমন বেড়েছে পাশাপাশি চা আমদানি নির্ভরতাও কমেছে। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানির জন্য চায়ের উৎপাদন আরও বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এজন্য উৎপাদন খরচ কমানো ও বৈচিত্র্যময় চা উৎপাদনের প্রচেষ্টাও চলমান আছে।

জাতীয় অর্থনীতি: উৎপাদনে অগ্রগতি হলেও রপ্তানিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে। এর প্রধান কারণ কী— উৎপাদন ব্যয়, মান নাকি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে যে কোনো পণ্যের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন ব্যয়। শ্রমিক মজুরি, জ্বালানি মূল্য প্রভৃতি নানাবিধ কারণে দেশের চা বাগানগুলোর উৎপাদন ব্যয় অন্যান্য দেশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি। তাই উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের গ্রিন টি ও অর্থোডক্স চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

জাতীয় অর্থনীতি: ২০২৪ সালে ৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রপ্তানি হয়েছে। এটিকে কি টেকসই ইতিবাচক ধারা হিসেবে দেখা যায়?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ২ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন কেজি চা রপ্তানি হয়েছে। চা রপ্তানি আরও বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ চা বোর্ড প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নিচ্ছে। এছাড়া বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসে কর্মরত কমার্শিয়াল কাউন্সিলরদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হয় এবং চায়ের নমুনা প্রেরণ করা হয়। চা রপ্তানি বৃদ্ধিতে বিভিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

জাতীয় অর্থনীতি: পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, কুয়েত ও ইতালিসহ বিদ্যমান রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশি চায়ের অবস্থান এখন কেমন?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশ হতে বেশিরভাগ চা পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি হয়ে থাকে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের দেশগুলোয় বসবাসরত বাংলাদেশিরাই মূলত আমাদের দেশের চায়ের প্রধান ক্রেতা।

জাতীয় অর্থনীতি: নতুন আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে বাংলাদেশ চা বোর্ডের কী কৌশল রয়েছে?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: চায়ের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে রাশিয়া, পাকিস্তানের মতো চা আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর সঙ্গে বার্টার পদ্ধতিতে রপ্তানির ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। এছাড়া বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসে কর্মরত কমার্শিয়াল কাউন্সিলরদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

জাতীয় অর্থনীতি: কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: আমাদের দেশের মানুষ দানাদার (সিটিসি ব্ল‍্যাক টি) ধরনের চা পান করে অভ্যন্ত। দেশের চাহিদা পূরণের জন্য আমাদের তৈরিকৃত প্রায় অধিকাংশ চা সিটিসি ব্ল‍্যাক টি। কেনিয়া ও ভারতে এই ধরনের সিটিসি চা উৎপাদন হলেও ভূমি, আবহাওয়া ভৌগোলিক কারণে তাদের চায়ের স্বাদ অপেক্ষাকৃত উন্নত। এছাড়াও ওইদেশগুলোয় উৎপাদনশীলতা আমাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি হওয়ায় তাদের চায়ের উৎপাদন খরচও কম। ফলে তারা বাংলাদেশের চেয়ে কম দামে ভালোমানের চা রপ্তানি করতে পারছে; যা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া শ্রীলঙ্কায় মূলত অর্থোডক্স ধরনের চা উৎপাদন হয়। চায়ের বৈচিত্র্যের স্বল্পতা এবং উৎপাদন বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ;

 যা উত্তরণের জন্য সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

জাতীয় অর্থনীতি: আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে কোয়ালিটি টি ব্র্যান্ডিং এবং ভ্যালু-অ্যাডেডে পণ্য উন্নয়নে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশের উন্নতমানের ও বৈচিত্র্যপূর্ণ চায়ের প্রসারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ চা বোর্ড একটি মডেল ব্ল‍্যান্ড ‘বাংলাদেশ টি’ স্বল্পপরিসরে বাজারজাত করছে। এছাড়া দেশের স্বনামধন্য চা কোম্পানিদের সঙ্গে নিয়ে চা বোর্ড প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ করে থাকে। বিভিন্ন ধরনের ভ্যালু অ্যাডেড চা উন্নয়নে চা বোর্ডের অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট নিয়মিত টি টেস্টিং ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল কোর্স পরিচালনা করছে।

জাতীয় অর্থনীতি: সিটিসি চায়ের বাইরে গ্রিন টি, হোয়াইট টি, অর্গানিক বা বিশেষায়িত চায়ে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কতটা?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশে সিটিসি চায়ের পাশাপাশি গ্রিন টি, হোয়াইট টি, অর্থোডক্স টি, অর্গানিক টি এবং অন্যান্য বিশেষায়িত বা ভ্যালু অ্যাডেড চায়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বিশ্ববাজারে স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের মধ্যে বিশেষায়িত চায়ের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য নতুন রপ্তানি সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) ২০১৬ সাল থেকে চায়ের বহুমুখী ব্যবহার ও ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য উন্নয়নে গবেষণা পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে জিনজার টি, মসলা টি, জেসমিন টি, মিন্ট টি, লেমন টি, তুলসি টি, আর্ল গ্রে টি ও সাতকরা টির মতো বিভিন্ন ভ্যালু অ্যাডেড চায়ের প্রটোকল উদ্ভাবন করা হয়েছে। এছাড়া চা থেকে ফেসিয়াল মাস্ক, সাবান, ক্যান্ডি ও কুকিজ তৈরির প্রযুক্তিও উন্নয়ন করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সাল থেকে বিটিআরআই কর্তৃক ‘Principles and Processes of Quality Tea Manufacturing’ নামক চা উৎপাদন-বিষয়ক এবং চায়ের গুণগতমান উন্নয়নে ‘Tea Testing and Quality Control’ বিষয়ক সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হচ্ছে যেখানে ব্ল‍্যাক টি, গ্রিন টি, অর্থোডক্স টি, হোয়াইট টি-সহ বিভিন্ন ধরনের ভ্যালু অ্যাডেড চা উৎপাদন-বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের ভ্যালু অ্যাডেড চা উৎপাদন শুরু করেছেন। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, বাজার উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের বিশেষায়িত চা শিল্প ভবিষ্যতে রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

জাতীয় অর্থনীতি: ক্ষুদ্র চা চাষি ও উত্তরাঞ্চলে চা চাষ সম্প্রসারণকে আপনি শিল্পের নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন কি?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: ক্ষুদ্র চা চাষি ও উত্তরাঞ্চলের চা বাংলাদেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ২১ শতাংশ অবদান রেখেছে। পূর্বে উত্তরাঞ্চলে চায়ের গুণগতমান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ছিল না। তাই উত্তরাঞ্চলের নিলামমূল্য অনেক কম ছিল। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ চা বোর্ড থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ আয়োজন ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের কারণে উত্তরাঞ্চলের চায়ের গুণগতমান ভালো হচ্ছে ও উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ২০২৫ সালে উত্তরাঞ্চল নিলামমূল্য ভালো পেয়েছে। আমরা আশা করি, ২০২৬ সালেও চায়ের নিলামমূল্য ভালো পাবে। ফলে আমি মনে করি উত্তরাঞ্চলের চায়ের সম্ভাবনা অনেক ভালো তাই নতুন নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে ক্ষুদ্র চা চাষির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

জাতীয় অর্থনীতি: জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রম ব্যয় ও উৎপাদন খরচ— এই তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চা বোর্ডের অগ্রাধিকার কোনটি?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: জলবায়ু পরিবর্তনে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিটিআরআইর বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। ইতোমধ্যে চায়ের কোন জাত খরা প্রতিরোধী, তা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং বাগানগুলোকে খরা প্রতিরোধী জাত রোপণের জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বাগানগুলোকে পর্যাপ্ত জলাধার নির্মাণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, যাতে খরা মৌসুমে জলাধার থেকে সেচ দেওয়া যায়। বাংলাদেশ চা বোর্ড এই লক্ষ্যে কাজ করছে। শ্রম ব্যয় ও উৎপাদন খরচও কমানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববাজারে চায়ের রপ্তানি বাড়াতে হলে উৎপাদন খরচ কমাতে হবে এবং চায়ের গুণগতমান আরও বাড়াতে হবে।

জাতীয় অর্থনীতি: আগামী ৫ বছরে বৈশ্বিক চা বাজারে বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান এবং সে লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ কি নিচ্ছেন?

মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ: দেশের চা রপ্তানি বজার সম্প্রসারণে লক্ষ্যে চা রপ্তানিকারকদের উৎসাহিত করতে প্রণোদনা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ চা বোর্ড থেকে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ চা বোর্ড চা রপ্তানিকারকদের সঙ্গে নিয়ে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মেলা-সোর্সিং ফেয়ারে অংশগ্রহণ করে থাকে। বাংলাদেশ চা বোর্ড উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। চায়ের উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি গুণগতমানের চা উৎপাদন করতে পারলে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা যাবে। বাংলাদেশ চা রপ্তানির পুরোনো ঐতিহ্য ফিরে পাবে। আগামী ৫ বছরে নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে বৈশ্বিক চা বাজারে বৈচিত্র্যময় চায়ের রপ্তানি বৃদ্ধি করে একটি সম্মানজনক স্থানে পৌঁছাতে পারবে।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত, উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল না-ও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখার বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ]