ফুটবলে কিছু খেলোয়াড় থাকে যাদের পরিচয় শুধু মাঠের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের গতি, ধারাবাহিকতা আর সময়জয়ী উপস্থিতি দিয়ে গড়ে ওঠে এক কিংবদন্তি। ব্রাজিলের ডান প্রান্তের সেই অবিরাম ছুটে চলা নামটির নাম কাফু-পুরো নাম মার্কোস ইভানগেলিস্তা দি মরিয়েস।
১৯৭০ সালের ৭ জুন জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার ফুটবল দুনিয়ায় পরিচিত হয়ে ওঠেন তার ডাকনাম ‘কাফু’ দিয়ে। এই নামের পেছনেও আছে এক মজার ইতিহাস। রাইট ফ্ল্যাঙ্কে বিদ্যুৎগতিতে ওঠানামা করার জন্য তাকে তুলনা করা হতো সত্তরের দশকের ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড কাফুরিঙ্গার সঙ্গে। সেই কাফুরিঙ্গার নাম থেকেই সংক্ষেপে তিনি হয়ে যান কাফু-যিনি পরে সত্যিকারের ‘এক্সপ্রেস ট্রেন’ হয়ে ওঠেন ফুটবল ইতিহাসে!
শৈশবে তিনি ছিলেন সাধারণ ছাত্র, পড়ালেখায় তেমন মনোযোগী নন, বরং ফুটবলেই ছিল তার পুরো মন। সাত বছর বয়সেই ফুটবলের প্রতি তার ঝোঁক শুরু হয়। এরপর দ্রুতই তিনি জায়গা করে নেন ন্যাসিওনাল-এসপির জুনিয়র দলে এবং পরে নিজ শহরের ক্লাব সাও পাওলোর যুব দলে। সেখানেই তার প্রতিভার আসল বিকাশ ঘটে, যখন কোচ টেলে সান্তানা তাকে মিডফিল্ড থেকে উইং ব্যাকে নামিয়ে দেন-একটি সিদ্ধান্ত যা তার ক্যারিয়ার বদলে দেয়। এই পজিশন পরিবর্তনই তাকে পরিণত করে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা রাইট ব্যাকে।
১৯৯০ সালে স্পেনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে বিখ্যাত হলুদ জার্সিতে তার অভিষেক ঘটে। তবে একই বছরের বিশ্বকাপে তিনি মূলত বদলি তালিকায় ছিলেন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপেও বেশির ভাগ সময় বেঞ্চে কাটান, কিন্তু ভাগ্য তার দরজা খুলে দেয় ফাইনালের ঠিক আগে। জর্জিনহোর ইনজুরিতে ইতালির বিপক্ষে ফাইনালের প্রায় পুরো ম্যাচে মাঠে নামেন কাফু, যা তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
ব্রাজিলের হয়ে তিনি চারটি বিশ্বকাপে খেলেছেন-১৯৯৪, ১৯৯৮ এবং ২০০২-এর মধ্যে টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছানোর অনন্য রেকর্ড গড়েন। এর মধ্যে ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়, আর ১৯৯৮ সালে স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে ফাইনালে হেরে যায়। ১৯৯৪ সালে ব্রাজিল ইতালিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, আর ২০০২ সালে জার্মানিকে হারিয়ে পেন্টা জয়ের আনন্দে মেতে ওঠে, যেখানে অধিনায়ক হিসেবে ট্রফি হাতে তুলেন কাফু।
এই টানা তিন বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার কীর্তিতে তিনি জার্মান কিংবদন্তি লোথার ম্যাথিউসের পাশে জায়গা করে নেন, যিনি ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত তিনটি ফাইনাল খেলেছিলেন। কাফুর এই রেকর্ড তাকে ফুটবল ইতিহাসে বিরল এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। তিনি একাই ব্রাজিলের হয়ে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন— মোট ১৪২টি।
তার ক্লাব ক্যারিয়ারও ছিল সমান সমৃদ্ধ। ১৯৯৭ সালে তিনি কোপা আমেরিকা জেতেন এবং ১৯৯৯ সালেও একই ট্রফি অর্জন করেন। ১৯৯৭ সালের ফিফা কনফেডারেশন কাপ জয় করেন তিনি ব্রাজিলের হয়ে। ১৯৯৪ সালে তিনি দক্ষিণ আমেরিকান বর্ষসেরা ফুটবলার নির্বাচিত হন। পাশাপাশি ২০০৮ সালে তিনি পান অফিসার অব দ্য অর্ডার অব রিও ব্রাঙ্কো সম্মাননা।
২০০২ বিশ্বকাপ ছিল কাফুর ক্যারিয়ারের অন্যতম আবেগঘন অধ্যায়। বাছাই পর্বে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স ছিল দুর্বল, এমনকি কোচ ভ্যান্ডারলি লুক্সেমবার্গ তাকে অধিনায়কত্ব থেকেও সরিয়ে দেন প্যারাগুয়ের বিপক্ষে লাল কার্ড পাওয়ার পর। পরে কোচ পরিবর্তনের মাধ্যমে স্কলারি দায়িত্ব নেন এবং ইনজুরির কারণে এমারসন না থাকায় আবারও কাফুর হাতে অধিনায়কত্ব ফিরে আসে। তার নেতৃত্বেই ব্রাজিল জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে পেন্টা জেতে। ট্রফি হাতে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে স্ত্রীকে উদ্দেশ করে চিৎকার করেন- ‘রেজিনা, আই লাভ ইউ!’
তবে ২০০৬ বিশ্বকাপে ৩৬ বছর বয়সে কাফু এবং ৩৩ বছর বয়সি রবার্তো কার্লোসকে খেলানো নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সেই আসরে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে ব্রাজিল বিদায় নেয়, যা কাফুর বিশ্বকাপ অধ্যায়ের শেষ অধ্যায় হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৮ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ফুটবল থেকে অবসর নেন।
তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার শেষ হয় মোট ২১ ম্যাচ খেলে-যা তাকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা বিশ্বকাপ ফুটবলারদের একজন বানায়। তিনি সত্যিই ছিলেন ‘কমিউটার’- যিনি ডান পাশের লেনে ট্রেনের মতো ছুটে গেছেন বারবার, কখনো ক্লান্ত না হয়ে, কখনও থেমে না গিয়ে!
কাফুর ফুটবল জীবন তাই শুধু শিরোপার গল্প নয়, বরং ধারাবাহিকতা, পরিশ্রম এবং অদম্য গতির এক অনন্য অধ্যায়— যেখানে ডান প্রান্ত কখনই ফাঁকা ছিল না, যতক্ষণ কাফু ছিলেন মাঠে!
একনজরে
নাম : মার্কোস ইভানগেলিজা দি মারিয়েস
জন্ম : ৭ জুন, ১৯৭০
উচ্চতা : ৫ ফিট ৯.৫ ইঞ্চি প্লেয়িং পজিশন : রাইট ব্যাক
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার : ১৯৯০-২০০
জাতীয় দল : ১৪২ ম্যাচ
বিশ্বকাপ : দুটি; ১৯৯৪ ও ২০০২
কোপা আমেরিকা : দুটি; ১৯৯৭ ও ১৯৯৯
ফিফা কনফেডারেশন কাপ একটি; ১৯৯৭ দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলার অব দ্য ইয়ার : একবার (১৯৯৪) অফিসার অব দ্য অর্ডার অব রিও ব্রাঙ্কো : ২০০৮