ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলাদেশের অন্যতম বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষক। বর্তমানে তিনি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, বাজেট, মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্যনীতি, আর্থিক খাত, দারিদ্র্য ও উন্নয়ন ইস্যুতে গবেষণা ও নীতি পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তিনি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বাজেট ঘাটতি ও রাজস্ব আহরণ ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেছেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাতীয় অর্থনীতি’র সিনিয়র সহ-সম্পাদক সানজিদ সকাল।
জাতীয় অর্থনীতি: মূল্যস্ফীতি এখনও সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগ। নতুন বাজেট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে, যা ইতিবাচক। খাদ্য সরবরাহ, কৃষি উৎপাদন, আমদানি ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক সুরক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু বাজেট দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য মুদ্রানীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নও প্রয়োজন। বাজেট সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, তবে ফলাফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
জাতীয় অর্থনীতি: নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে বাজেটে কী ধরনের বাস্তব পদক্ষেপ রয়েছে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, কৃষি ও খাদ্য খাতে সহায়তা এবং কিছু ক্ষেত্রে কর-সুবিধা সাধারণ মানুষের জন্য ইতিবাচক। তবে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বেশি। তাদের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মূল্যস্ফীতি কমানো এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা।
জাতীয় অর্থনীতি: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ কি বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যথেষ্ট?
ড. ফাহমিদা খাতুন: বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েছে, যা ইতিবাচক। তবে দারিদ্র্য ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বিবেচনায় চাহিদাও বেড়েছে। তাই শুধু বরাদ্দ বাড়ানো নয়, সঠিক ব্যক্তির কাছে সুবিধা পৌঁছানো এবং অপচয় কমানো আরও গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকারিতা বাড়ানো গেলে বর্তমান বরাদ্দ থেকেও ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।
জাতীয় অর্থনীতি: কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে কম। বাজেটে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা কতটা বাস্তবসম্মত?
ড. ফাহমিদা খাতুন: রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সহজ হবে না। গত কয়েক বছর ধরেই রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, আমদানি ও বিনিয়োগ বাড়লে রাজস্বও বাড়বে। কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং করের আওতা সম্প্রসারণ ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: কর ব্যবস্থায় সংস্কারের মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধে বাজেট কতটা কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: ডিজিটাল কর প্রশাসন, স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় এবং কর ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে কর ফাঁকি কমতে পারে। তবে আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোও প্রয়োজন।
জাতীয় অর্থনীতি: পরোক্ষ করের চাপ কি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর আরও বোঝা সৃষ্টি করবে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: পরোক্ষ কর সাধারণত ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলে, কারণ তা পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাই কিছু ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। তবে সরকার সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই চাপ কমানোর চেষ্টা করেছে।
জাতীয় অর্থনীতি: শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব কমাতে বাজেটে কী সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ রয়েছে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা সহায়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে তরুণদের কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধানে শুধু প্রশিক্ষণ নয়, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিই সবচেয়ে জরুরি। বাজেট এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছে, কিন্তু বাস্তব ফল নির্ভর করবে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কতটা বাড়ে তার ওপর।
জাতীয় অর্থনীতি: দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাজেটের প্রণোদনাগুলো কতটা কার্যকর হবে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: বিনিয়োগবান্ধব কিছু উদ্যোগ রয়েছে, যা ইতিবাচক। তবে বিনিয়োগকারীরা শুধু কর-সুবিধা দেখেন না। তারা নীতি স্থিতিশীলতা, জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসার পরিবেশও বিবেচনা করেন। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি হলে বাজেটের প্রণোদনা আরও কার্যকর হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বাজেট কতটা সহায়ক?
ড. ফাহমিদা খাতুন: এসএমই খাত কর্মসংস্থানের বড় উৎস। বাজেটে এই খাতের জন্য অর্থায়ন ও সহায়তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে অনেক উদ্যোক্তার প্রধান সমস্যা হচ্ছে ঋণপ্রাপ্তি, উচ্চসুদের হার এবং বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা। এসব সমস্যার সমাধান হলে বাজেটের সুবিধা আরও কার্যকর হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কৃষি খাতের বরাদ্দ কি যথেষ্ট?
ড. ফাহমিদা খাতুন: কৃষি এখনও খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি। বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ হলেও উৎপাদন ব্যয়ও অনেক বেড়েছে। তাই শুধু বরাদ্দ নয়, সারের প্রাপ্যতা, সেচ, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নও প্রয়োজন। কৃষকদের জন্য এসব সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বরাদ্দের কার্যকারিতা বাড়বে।
জাতীয় অর্থনীতি: খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাজেটে কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য মজুদ, কৃষি গবেষণা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, কৃষির আধুনিকায়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। বাজেট এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
জাতীয় অর্থনীতি: শিক্ষা খাতের বরাদ্দ কি মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে যথেষ্ট?
ড. ফাহমিদা খাতুন: শিক্ষা খাতের বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ হলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় এখনও সীমিত। শুধু বরাদ্দ বাড়ানো নয়, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, দক্ষতা শিক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
জাতীয় অর্থনীতি: স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে বাজেটে কী নতুন উদ্যোগ রয়েছে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং সেবার সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান ও প্রাপ্যতা। সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ এখনও নিজস্ব পকেট থেকে আসে। তাই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় অর্থনীতি: অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়িত হয় না। বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
ড. ফাহমিদা খাতুন: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়ন সক্ষমতা। প্রকল্প অনুমোদন, জমি অধিগ্রহণ, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং সমন্বয়ের দুর্বলতার কারণে অনেক প্রকল্পে বিলম্ব হয়। বাজেটের সাফল্য মূলত নির্ভর করবে কত দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর।
জাতীয় অর্থনীতি: বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারের ঋণনির্ভরতা ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
ড. ফাহমিদা খাতুন: একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য সীমিত পরিসরে ঋণ গ্রহণ স্বাভাবিক। তবে ঋণ যদি দ্রুত বাড়তে থাকে এবং তার বিপরীতে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল না আসে, তাহলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ ঋণ বেশি হলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ঘাটতি অর্থায়নের পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ব্যয়ের দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।