শফিকুল ইসলাম শামীম: জাতীয় বাজেটকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন আগ্রহ থাকে, তেমনি থাকে ব্যবসায়ী সমাজেরও নানা প্রত্যাশা ও উদ্বেগ। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার আগে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। কারণ তাদের কাছে বাজেট মানেই যেন নতুন করে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়ে যাওয়া।
তবে এবার নতুন সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট সামনে রেখে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আশা করছেন ভিন্ন কিছু। তারা চান এমন একটি বাজেট, যা ব্যবসাকে আরও সহজ করবে, বাজারকে স্থিতিশীল রাখবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার, বিপণিবিতান, কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এখন বাজেট নিয়ে আলোচনা চলছে। মুদি দোকানদার থেকে শুরু করে কাপড় ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উৎপাদক কিংবা মৌসুমি ব্যবসায়ী সবারই একটি সাধারণ প্রশ্ন, বাজেটের পর আবার কি সবকিছুর দাম বাড়বে?
বিগত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতির চাপ, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নানা সংকটে পড়েছেন।
অনেক ব্যবসায়ী বলছেন, ব্যবসার খরচ বাড়লেও বিক্রি সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে লাভ কমে যাচ্ছে এবং অনেকেই টিকে থাকার লড়াই করছেন।
রাজধানীর একটি মুদি দোকানের ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, প্রতি বছর বাজেটের আগে থেকেই কিছু কিছু পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। পরে দেখা যায় বাজারে নতুন অজুহাত তৈরি হয়। আমরা চাই এবার এমন বাজেট হোক যাতে সাধারণ মানুষ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী উভয়েই স্বস্তি পায়।
কারওয়ানবাজরের ফল ব্যবসায়ী ইলিয়াস আলী অভিযোগ করে বলেন, বাজেট প্রণয়নের সময় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট খাতের বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়। অথচ দেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ পরিচালিত হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে এই খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মোট কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। তাই এই খাতকে শক্তিশালী করা মানে অর্থনীতির ভিতকে আরও মজবুত করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনো জানেন না বাজেটে তাদের জন্য কী সুযোগ-সুবিধা থাকে কিংবা নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো তাদের ব্যবসায় কী প্রভাব ফেলে।
অনেকের কাছে বাজেট মানেই ভ্যাট বৃদ্ধি, কর বৃদ্ধি কিংবা পণ্যের দাম বাড়ার ঘোষণা। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। একটি সঠিক ও বাস্তবমুখী বাজেট ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে পারে, উৎপাদন ব্যয় কমাতে পারে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে। তাই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যেও বাজেট সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অন্যতম বড় সমস্যা হলো অর্থায়ন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে নানা ধরনের কাগজপত্র, জামানত এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে অনেক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহ করতে পারেন না। বাধ্য হয়ে তারা অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেন, যা ব্যবসার জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।
সবজি ব্যবসায়ী সোবাহান মিয়া বলেন, সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া গেলে তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। তাই এবারের বাজেটে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ এবং সহজ অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, বড় ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রবণতাও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। অনেক সময় বাজেট ঘোষণার আগেই কিছু ব্যবসায়ী সম্ভাব্য কর বৃদ্ধি বা শুল্ক পরিবর্তনের অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। এর প্রভাব পড়ে সাধারণ ভোক্তা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। কারণ বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই পণ্য কিনে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করতে হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটকে কেন্দ্র করে কৃত্রিম সংকট ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে কার্যকর বাজার তদারকি প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান সময়ে ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন পেমেন্ট এবং ডিজিটাল লেনদেন ব্যবসাকে সহজ করছে। কিন্তু অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখনো এই ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। তবে, ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহ দিতে কর সুবিধা, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানো হলে ক্ষুদ্র ব্যবসার কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
এছাড়া উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রম, ব্যবসা ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ, বাজার সম্প্রসারণ এবং পণ্যের মান উন্নয়নে সরকারি সহায়তা বাড়ানোরও দাবি রয়েছে। কারণ শুধু অর্থায়ন নয়, দক্ষতা ও বাজার সংযোগও একটি ব্যবসার সফলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মূল্যস্ফীতির বর্তমান চাপ মোকাবিলা করাও এবারের বাজেটের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। খাদ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উৎপাদন ব্যয় কমানো গেলে বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা কমবে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আল আমীন বলেন, তারা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না। শুধু এমন একটি পরিবেশ চান যেখানে সৎভাবে ব্যবসা করে টিকে থাকা সম্ভব হবে। সহজ ঋণ, কম প্রশাসনিক জটিলতা, স্থিতিশীল বাজার এবং যৌক্তিক কর কাঠামো তাদের প্রধান প্রত্যাশা।
নতুন সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট। তাই শুধু রাজস্ব আয় বা উন্নয়ন ব্যয়ের হিসাব নয়। এটি দেশের লাখো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ভবিষ্যৎ প্রত্যাশারও প্রতিচ্ছবি। তারা আশা করছেন, এবারের বাজেটে এমন নীতিগত সহায়তা থাকবে যা ব্যবসা পরিচালনায় স্বস্তি দেবে, কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে।
এখন অপেক্ষা শুধু বাজেট ঘোষণার। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন একটাই, বাজেট কি আবারও পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণ হবে, নাকি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করে তাদের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসবে?
উত্তর মিলবে বাজেট ঘোষণার দিন। তবে অর্থনীতির বাস্তবতা বলছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখা এবং শক্তিশালী করাই হতে পারে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কারণ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবিকা, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই ক্ষুদ্র ব্যবসা খাত। তাই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাঁচিয়ে রাখার নৈতিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই।
—জা.অর্থনীতি/এনজে