নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে বড় বাধা কর কাঠামো বৈষম্য
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বর্তমান কর কাঠামো বৈষম্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। 

সংস্থাটি বলেছে, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আহরণের লোভে এ খাত থেকে বের হতে পারছে না সরকার, যা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তির পথে বড় ধরনের কর কাঠামো বৈষম্য তৈরি করছে।

রোববার (৭ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে এসব কথা বলে সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। ‘জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে রাজস্ব বৈষম্য: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প সমাধান’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে সিপিডি।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত, গবেষণা সহযোগী আতিকুজ্জামান সাজিদ, খালিদ মাহমুদ প্রমুখ।

এ সময় জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যকার রাজস্ব বৈষম্যের বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এতে জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় বিকল্প সমাধানের কথা তুলে ধরেন তিনি।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নীতিগত বৈষম্যের কারণে দেশে নতুন ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি আসার পথ এখনো সংকুচিত রয়েছে।

রাজস্ব নির্ভরতা ও আমদানিতে অনীহা পর্যালোচনা বিশ্লেষণ তুলে ধরে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকার সবসময় পরোক্ষ করের মাধ্যমে বাড়তি রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা করে। বর্তমানে পেট্রোল ও ডিজেল চালিত যানবাহনের ওপর যে কর কাঠামো রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে বৈদ্যুতিক যান বা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো উৎসাহ নেই। উল্টো বৈদ্যুতিক যান, গ্রিড এবং বিদ্যুৎ সঞ্চয়কারী উপকরণের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক ও কর আরোপ করা আছে। ফলে শিল্প, বাণিজ্যিক বা গৃহস্থালি—সব ক্ষেত্রেই মানুষ তেল-ভিত্তিক জ্বালানির ওপর নির্ভর থাকতে বাধ্য হচ্ছে। 

কর কাঠামোর বৈষম্য ও রাজস্ব ক্ষতি রাজস্ব নীতিতে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে বলে ‍উল্লেখ করেন সিপিডির এই গবেষণা পরিচালক। তিনি বলেন, বর্তমানে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানিতে শূন্য শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, অথচ সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের উপকরণের ওপর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট বজায় রাখা হয়েছে। যদি এলএনজি আমদানিতে সৌর বিদ্যুতের সমপরিমাণ ভ্যাট আরোপ করা হতো, তবে সরকারের বাড়তি ১ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো। 

একইভাবে তেল, এলএনজি এবং কয়লার ওপর আরোপিত শুল্ক যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানির শুল্ক হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হতো, তবে সরকার এলএনজি থেকে ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা এবং কয়লা থেকে ৬৬৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব পেতে পারতো। অর্থাৎ, জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিকারকদের অন্যায্য সুবিধা দিতে গিয়ে সরকার নিজেই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।

ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিকল্প প্রযুক্তিতে শুল্ক বাধা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে সরকার প্রায়ই ডিজেলের দাম বাড়াতে চায় না। কিন্তু কৃষি সেচ, ট্রাক বা ব্যক্তিগত গাড়িতে ডিজেলের বিকল্প হিসেবে যে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব, সেগুলোর ওপর শুল্ক কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। যদি এই বিকল্প যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো হতো, তবে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আধুনিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকতো এবং এতে সরকারের রাজস্ব হারানোর ভয় থাকতো না, কারণ ওই সব পণ্যের আমদানি বাড়লে সেখান থেকেও রাজস্ব আসার সুযোগ তৈরি হতো।

বাজেট প্রণয়নের সময় বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী বা চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর প্রভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খায় বলে উল্লেখ করেছেন সিপিডির গোলাম মোয়াজ্জেম।  

তিনি বলেন, চাপ সৃষ্টির ফলে একটি বৈষম্যমূলক রাজস্ব কাঠামো তৈরি হয়েছে যেখানে সবুজ রাজস্ব নীতি উপেক্ষিত থাকছে। বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন গোলাম মোয়াজ্জেম। 

সিপিডি মনে করছে, সরকার যে দামে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনে এবং যে পাইকারি মূল্যে তা বিক্রি করে, এর বিশাল ব্যবধানই হচ্ছে সরকারের বাড়তি ব্যয়ের মূল কারণ। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি প্রতিযোগিতামূলক এবং পরিবেশবান্ধব কর কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে সিপিডি।

 —জা.অর্থনীতি/এনজে