মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত

ব্যাংকের নিখুঁত স্টেটমেন্ট আর পকেটে থাকা চকচকে আইনি কাগজ—এগুলো থাকলেই কি আপনার উপার্জিত সম্পদ হালাল হয়ে যায়? শিকাগোর কুখ্যাত মাফিয়া ডন আল ক্যাপোন যেভাবে তার অবৈধ মদের ব্যবসার 'নোংরা' টাকা লন্ড্রি ব্যবসার আয়ের সাথে মিশিয়ে 'সাদা' করত, আজ আমাদের সমাজেও ঠিক একইভাবে ঘুষ, দুর্নীতি আর কর ফাঁকির টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে ঢুকিয়ে বৈধ করার এক মহোৎসব চলছে। যার আধুনিক নাম—মানিলন্ডারিং।

পার্থিব আইনকে ফাঁকি দিয়ে কালো টাকাকে সাদা করা গেলেও, আল্লাহর দরবারে কি এই 'অর্থ ধোলাই' গ্রহণযোগ্য?

যদিও মানিলন্ডারিং একটি আধুনিক পরিভাষা, কিন্তু এর পেছনে থাকা অপরাধগুলোকে ইসলাম শত শত বছর আগেই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, এটি অন্যায় উপার্জন, প্রতারণা, ঘুষ ও তথ্য গোপনের একটি মারাত্মক সমষ্টি।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে সুরা আন-নিসার ২৯ আয়াতে বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অগ্রহণযোগ্য উপায়ে ভক্ষণ করো না।’

বাহ্যিক লেনদেন যতই নিয়মতান্ত্রিক দেখাক না কেন, রসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী খুবই স্পষ্ট—‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম)।

আমরা অনেকেই অবৈধ টাকায় দান-সদকা করে পাপ মোচনের চেষ্টা করি। কিন্তু হাদিসে এসেছে, পবিত্রতা ছাড়া নামাজ কবুল হয় না এবং হারাম উপায়ে অর্জিত সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করা হয় না।

আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমির মতে, মানিলন্ডারিং হলো ‘ফাসাদ ফিল আরদ’ বা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির নামান্তর, যা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।

আজকের যুগে এফএটিএফ (FATF) বা বিএফআইইউ (BFIU)-এর মতো সংস্থাগুলো কেওয়াইসি (KYC) বা সিডিডি (CDD)-এর মাধ্যমে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। কিন্তু শুধু কাগজের আইন দিয়ে এই অপরাধ পুরোপুরি দমন করা সম্ভব নয়। ইসলাম এখানে কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান দেয়:

১. শয়তানের দারিদ্র্যের ভয় এবং প্রাচুর্যের লোভ মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। পরকালের হিসাবদিহিতার ভয়ই মানুষকে অবৈধ অর্থ থেকে দূরে রাখতে পারে।

২. আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতোই কোরআন নির্দেশ দিয়েছে—‘যেকোনো লেনদেন লিখে রাখো।’(সূরা বাকারা: ২৮২)।

৩. সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হলে অবৈধ উপায়ে সম্পদ পাহাড় করার মানসিকতা কমে আসে।

দুনিয়ার আইন আর লেয়ারিংয়ের মারপ্যাঁচে সিসিটিভি ক্যামেরা বা অডিটরকে হয়তো ফাঁকি দেওয়া সম্ভব, কিন্তু হাশরের ময়দানে প্রতিটা পয়সার হিসাব দিতেই হবে। মনে রাখবেন, হারাম থেকে গড়ে ওঠা দেহের শেষ ঠিকানা কিন্তু জাহান্নাম। তাই আজই ভাবুন, আপনার উপার্জন ধোয়া-মোছা করা পরিষ্কার তো?

জা. অর্থনীতি/ উমার