তিন বছর কাগজেই আটকা ঢাকার ৪ খাল পুনরুদ্ধার

মোফাজ্জল বিদ্যুৎ, ঢাকা: রাজধানীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের জন্য প্রায় ৯০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিন বছরেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মাস বাকি। খালগুলো এখনও বেদখল, দূষণ ও আবর্জনায় মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। এই প্রকল্পে এর মধ্যে ১৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। শুধু তাই নয়, চলতি অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে আরও ৪৫ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। ফলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প কার্যত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ।

স্বাধীনতার পর ঢাকায় প্রায় ৫৭টি খাল ছিল। কিন্তু দখল ও ভরাটের কারণে বর্তমানে এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৬টিতে।

রাজধানীর দক্ষিণ অংশে অনেক খালের অবস্থা এখন অত্যন্ত নাজুক। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই সংশ্লিষ্ট এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়; চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী।

এমন পরিস্থিতিতে কালুনগর, জিরানি, মান্ডা ও শ্যামপুর খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার এবং নান্দনিক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রায় ৮৯৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পায়।

২০২৬ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। প্রকল্পের লক্ষ্য অনুযায়ী, খালগুলোর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করা, জলাবদ্ধতা কমানো এবং দুই পাড়ে ওয়াকওয়ে, বাইসাইকেল লেন, খেলার মাঠ, ফুডকোর্ট, নাগরিক সুবিধা ও সবুজায়নের মাধ্যমে আধুনিক জনপরিসর তৈরি করার কথা ছিল। কিন্তু তিন বছরেও ডিএসসিসি দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে পারেনি। 

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চার খালের মধ্যে সবচেয়ে বড় মান্ডা খালের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার। এ খালের দুই পাড়ে ছয়টি যানবাহন সেতু, ২২টি পথচারী সেতু, পাঁচটি ফুডকোর্ট ও চারটি প্লাজাসহ বিভিন্ন সুবিধা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ খালের উন্নয়নেই ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৯৭কোটি টাকা। কিন্তু তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।

মান্ডা এলাকার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, বারবার খাল পুনরুদ্ধারের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কিছু হচ্ছে না। পরিস্থিতি দিন দিন আরও নাজুক হয়ে পড়ছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও কোথাও মাত্র ১৫ মিনিটের ভারী বৃষ্টিতেই ঘরবাড়ি ও ছোট দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, মান্ডা এলাকায় খালের পুরো অংশ জুড়ে দুর্গন্ধযুক্ত কালো পানি জমে আছে। খালের মধ্যে প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল ও গৃহস্থালির বিভিন্ন বর্জ্যের স্তূপ পড়ে রয়েছে। দুই পাড়ে আবর্জনার ভাগাড় থেকে ছড়িয়ে পড়া তীব্র দুর্গন্ধে এলাকাবাসীর টিকে থাকাই কঠিন হয়ে উঠেছে। শুধু দূষণই নয়, খালের দুই পাশে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক জায়গায় খালের সীমানা ভরাট করে কার্যত ড্রেনে পরিণত করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সুমন রহমান জানান, মান্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছন থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত খালপাড় দখলের এক ধরনের 'মহোৎসব' চলছে। খালের সীমানা অতিক্রম করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, যার কিছু অংশ ভেঙে খালের ভেতরে পড়ে পানির প্রবাহে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।

বাকি তিনটি খালের মধ্যে শ্যামপুর খালের দৈর্ঘ্য ৪ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার। এখানে ১৭ হাজার বর্গমিটার এলাকায় সবুজায়ন ও ল্যান্ডস্কেপিং, ১৯২টি বৈদ্যুতিক পোল ও নান্দনিক বাতি স্থাপন, ১০০টি ওয়েস্টবিন এবং শিশুদের খেলার মাঠ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা।

আর কালুনগর খালের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার। এ খালের দুই পাশে পথচারী সেতু, পাম্প হাউজ, ওয়াকওয়ে, বৈদ্যুতিক বাতি, বসার বেঞ্চ ও ফুডকোর্টসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা নির্মাণে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৯৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এছাড়া জিরানি খালের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৯ কিলোমিটার। এখানে ওয়াকওয়ে, বাইসাইকেল লেন, পাবলিক টয়লেট, ব্যায়াম শেড এবং সবুজায়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষের সময় ধরা হলেও প্রকল্পের বড় অংশের কাজ শুরুই হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন অবস্থায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) এই প্রকল্পের প্রথম থেকে তৃতীয় কিস্তি মিলিয়ে ৪৫ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও ইতোমধ্যে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানা গেছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, প্রকল্পে শুরুতে কিছু অপ্রয়োজনীয় খাত অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিশেষ করে পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সংশ্লিষ্ট এলাকায় মানুষের পদচারণা কম হওয়ায় পরে তা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া আরও কিছু খাতে ব্যয় অপ্রয়োজনীয় ও অত্যধিক হওয়ায় প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাব (ডিপিপি) কয়েকবার সংশোধন করতে হয়েছে, যার কারণে বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। 'দৃশ্যমান কাজ ছাড়াই ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ের' বিষয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পের কিছু কারিগরি বিষয় ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে এ ব্যয় হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি শুরু থেকেই অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ব্যয়ের কারণে জটিল হয়ে পড়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, জলাশয় পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা। খালের পাড়ে গাছ লাগিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করাই সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ হতে পারত।

তার ভাষ্য, আগের সরকার প্রকল্পটিকে বড় দেখাতে অনেক অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো যুক্ত করেছিল, যার ফলে অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিয়ে নতুনভাবে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করা এবং নতুন করে দখল ঠেকাতে কঠোর আইন প্রয়োগ করা।