জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পেট্রোল বা ডিজেলের খরচই বাড়ে না, পুরো অর্থনীতিতে শুরু হয় প্রভাবের চেইন। বাড়ে আমদানি বিল, পরিবহন ব্যয় ও শিল্পের উৎপাদন খরচ। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ পৌঁছাতে পারে সাধারণ মানুষের বাজারের ব্যাগেও।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বিষয়টি দ্রুতই অর্থনৈতিক উদ্বেগে পরিণত হয়। কারণ অপরিশোধিত তেলের দাম শুধু জ্বালানি আমদানির হিসাব বদলায় না, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পরিবহন, শিল্প, বিদ্যুৎ এবং ভোক্তা বাজারেও।
গত ২৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯২ ডলারে উঠেছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ছিল প্রায় ৮৫ ডলার। প্রশ্ন হলো ৯০ ডলারের তেল বাংলাদেশের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় বাড়লো তেলের দাম
প্রথম ধাক্কা আসে আমদানি বিলে
বাংলাদেশকে জ্বালানি আমদানির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার পরিশোধ করতে হয়। তেলের দাম বাড়লে একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতেই বেশি ডলার প্রয়োজন হয়। ফলে দেশের মোট আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
পরিবহন খরচ বাড়ে
ট্রাক, বাস, নৌযান কিংবা পণ্য পরিবহনের বিভিন্ন মাধ্যম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পণ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার খরচও বাড়তে পারে।
উৎপাদন ব্যবস্থায় বাড়তি ব্যয়
কারখানায় কাঁচামাল পরিবহন থেকে শুরু করে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি চালানো—সব জায়গাতেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে।
আর উৎপাদন খরচ বাড়লে ব্যবসার সামনে থাকে কঠিন সিদ্ধান্ত। প্রতিষ্ঠান হয় মুনাফার অংশ কমাবে, নয়তো বাড়তি খরচের একটি অংশ পণ্যের দামের মধ্যে সমন্বয় করবে।
আরও পড়ুন: অবাধ বৈশ্বিক বাণিজ্যের যুগ কি শেষ?
এভাবেই আন্তর্জাতিক বাজারের একটি ব্যারেল তেলের দাম শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বাজারের একটি পণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ৯০ ডলার মানেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সংকট এমন সরল হিসাব করা ঠিক নয়।
কারণ তেলের দামের প্রভাব নির্ভর করে দাম কতদিন এই পর্যায়ে থাকে, বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ কত, ডলারের বিনিময় হার কেমন এবং সরকার জ্বালানি মূল্য ও ভর্তুকির ক্ষেত্রে কী নীতি নেয় তার ওপর।
ঝুঁকি কখন?
একটি সহজ হিসাব দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। ৭০ ডলারের তেল হলে আমদানি ব্যয়ের চাপ তুলনামূলকভাবে সামলানো সহজ হতে পারে। ৯০ ডলারে গেলে চাপ বাড়তে শুরু করে বিশেষ করে যদি দাম দীর্ঘ সময় এই পর্যায়ে থাকে। আর ১১০ ডলারের মতো পর্যায়ে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। তখন আমদানি বিল, ভর্তুকি, পরিবহন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি একাধিক জায়গায় একসঙ্গে চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
আরও পড়ুন: ২০৩০ সালে বিশ্বের ৩২তম অর্থনীতি হবে বাংলাদেশ
তবে এই সংখ্যাগুলো কোনো সরকারি ‘ঝুঁকি সীমা’ নয়। বাংলাদেশের জন্য ঠিক কোন দামে সংকট তৈরি হবে, তা নির্ভর করবে একই সময়ে ডলারের দাম, রিজার্ভ, আমদানি চাহিদা, জ্বালানি ব্যবহার এবং সরকারি নীতির ওপর।
বৈদেশিক মুদ্রার চাপ
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈদেশিক মুদ্রা। তেলের দাম বাড়লে বেশি ডলার দিয়ে জ্বালানি কিনতে হয়। ফলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় থেকে আসা ডলারের একটি বড় অংশ আমদানি ব্যয়ে চলে যেতে পারে। এতে রিজার্ভের ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই বাংলাদেশের জন্য তেলের দাম শুধু জ্বালানির হিসাব নয়। এটি ডলার, আমদানি, মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ও মানুষের জীবনযাত্রার খরচ সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত।
তাই নজর থাকবে একটি প্রশ্নে- তেলের দাম ৯০ ডলারের ওপরে কতদিন থাকে, আর বিশ্ববাজারে এটি আরও কতটা ওপরে যেতে পারে? কারণ কয়েক দিনের দাম আর কয়েক মাসের দাম বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য দুটির ঝুঁকি এক নয়।