ব্যাংক ও ব্লক মার্কেটের প্রাতিষ্ঠানিক কেনাকাটায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: টানা কয়েক সপ্তাহের দরপতনে বিপর্যস্ত দেশের পুঁজিবাজারে ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছে ক্রেতাদের অংশগ্রহণ। তবে সাম্প্রতিক এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দর কষাকষি নয় বরং ব্যাংক খাতের বড় মূলধনি কোম্পানিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা এবং ব্লক মার্কেটে বড় অঙ্কের শেয়ার হাতবদলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে পূবালী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের শেয়ারে একযোগে কেনাকাটা বাজারের গতিপথ পরিবর্তনে সহায়তা করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ দরপতনের পর অপেক্ষাকৃত কম দামে শেয়ার সংগ্রহের প্রবণতা। ফলে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ঊর্ধ্বমুখী ধারায় লেনদেন শেষ হয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই)।

গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৭১ দশমিক ৪১ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৪১৩ দশমিক শূন্য ৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের কার্যদিবসেও সূচকটি ইতিবাচক ধারায় ছিল। দিনটিতে বাজারে লেনদেন হওয়া ৩৮৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৫০টির দর বেড়েছে, কমেছে ৮৪টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৫১টির দর। তবে সূচকের উত্থানের চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল লেনদেনের পরিমাণ ও অংশগ্রহণকারীদের সক্রিয়তা।

বাজারের এই পুনরুদ্ধারে ব্যাংক খাতের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে দৃশ্যমান। বৃহস্পতিবার খাতটির মোট লেনদেন হয়েছে ৬০ কোটি ৬০ লাখ টাকার বেশি। ডিএসইএক্স সূচকে পূবালী ব্যাংক একাই যোগ করেছে ৭ দশমিক ৬ পয়েন্ট। ব্র্যাক ব্যাংকের অবদান ৬ দশমিক ৯ পয়েন্ট। এছাড়া প্রাইম ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক যোগ করেছে যথাক্রমে ৪ দশমিক ৪ পয়েন্ট করে। অর্থাৎ চারটি ব্যাংকের সম্মিলিত অবদানই সূচকের উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে। সাম্প্রতিক দরপতনে ব্যাংক খাতের শেয়ারগুলোর মূল্য কমে আসায় বিনিয়োগকারীরা নতুন করে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ দেখছেন বলে বাজারের লেনদেনের ধরনে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া গেছে ব্লক মার্কেটে। বৃহস্পতিবার সেখানে ৩৭টি কোম্পানির মোট ৩২ কোটি ৪২ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা, গ্রামীণফোনের ৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা, জিকিউ বলপেনের ২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, সিটি ইন্স্যুরেন্সের আড়াই কোটি টাকা এবং এনভয় টেক্সটাইলের ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। বিশেষ করে ব্র্যাক ব্যাংকের বড় অঙ্কের ব্লক লেনদেন ব্যাংকটির শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক আগ্রহের বিষয়টি সামনে এনেছে। তবে ব্লক মার্কেটে শেয়ার হাতবদল হলেই সেটিকে নিট বিনিয়োগ বা নতুন করে শেয়ার সংগ্রহ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বাজারে লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধিও পুনরুদ্ধারের ধারাকে সমর্থন করছে। বৃহস্পতিবার মূল বাজারে লেনদেন আগের দিনের তুলনায় ২৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেড়ে ৬১৩ কোটি ১ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্লক মার্কেটসহ মোট লেনদেন হয়েছে ৬৪৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। একইসঙ্গে শেয়ার লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ২৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ সূচকের উত্থানের পাশাপাশি বাজারে অর্থের প্রবাহও বেড়েছে। তবে লেনদেনের বড় অংশ এখনও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিয়ন্ত্রণে। মোট লেনদেনে তাদের অংশগ্রহণ ছিল ৮৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অবশ্য বিক্রির ধারায় ছিলেন।

বাজারের জন্য ইতিবাচক আরেকটি বিষয় হলো অবকাঠামো, জ্বালানি ও ডিজিটাল প্রকল্পে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের সার্বভৌম তহবিল গঠনের বিষয়ে সরকারের বিবেচনার খবর। যদিও এটি এখনও সম্ভাব্য উদ্যোগ, তবু অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিয়ে বাজারে প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে।

তবে দুই দিনের উত্থানকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা পরিবর্তনের সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বৃহস্পতিবারও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির প্রবণতা অব্যাহত ছিল। ফলে বাজারের পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই হবে তা নির্ভর করবে প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা, কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফল এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর। বিশেষ করে সাম্প্রতিক দরপতনের পর তৈরি হওয়া কেনাকাটার প্রবণতা নতুন করে বিক্রির চাপে ভেঙে পড়ে কিনা, সেটিই এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় পর্যবেক্ষণের বিষয়।