দক্ষিণের ৫৭ ওয়ার্ডই ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫ ওয়ার্ডের মধ্যে ৫৭টিতে এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সূচকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ২৯টি ওয়ার্ড। 

গতকাল বুধবার নগর ভবন অডিটরিয়ামে বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপ-২০২৬ এর ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানায় ডিএসসিসি।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, পরিদর্শন করা ২ হাজার ২৫০টি বাড়ির মধ্যে ৩২২টিতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ নমুনা হিসেবে পরিদর্শন করা প্রায় ১৪ দশমিক ৩১ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার প্রজননের প্রমাণ মিলেছে।

বাড়ির ধরন অনুযায়ী, একক বাড়িতে সবচেয়ে বেশি ৩১ দশমিক ৩৭ শতাংশ লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। বহুতল ভবনে এ হার ৩১ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। এ ছাড়া সেমিপাকা বাড়িতে ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, নির্মাণাধীন বাড়িতে ১৩ দশমিক শূন্য ৪ এবং খালি প্লটে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ লার্ভা ও পিউপা মিলেছে। 

গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। ১২ দিনের এ জরিপে ডিএসসিসির ৭৫ ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ৩০টি করে মোট ২ হাজার ২৫০ বাড়ি নমুনা হিসেবে নির্বাচন করা হয়। জরিপে ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ৩৬ মাঠকর্মী অংশ নেন। তথ্য সংগ্রহের নির্ভুলতা নিশ্চিতে ব্যবহার করা হয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘কোবোটুলবক্স’। 

জরিপে মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে সবচেয়ে বেশি চিহ্নিত হয়েছে প্লাস্টিকের বালতি। এসব পাত্রে মিলেছে ১৪ দশমিক ২১ শতাংশ লার্ভা। এ ছাড়া প্লাস্টিকের ড্রামে ১১ দশমিক ২২ শতাংশ, বেজমেন্টে জমে থাকা পানিতে ৯ দশমিক ৯৮, প্লাস্টিকের মগে ৯ দশমিক ২৩ এবং ফুলের টবে ৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ লার্ভা শনাক্ত হয়েছে।

ওয়ার্ডভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিএসসিসির ২৯ ওয়ার্ড অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ২৮টি মাঝারি এবং ১৮টি সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ সংস্থাটির সব ওয়ার্ডই ঝুঁকির কোনো না কোনো শ্রেণিতে পড়েছে।

জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণে ব্রেটো ইনডেক্স (বিআই), হাউজ ইনডেক্স (এইচআই), কনটেইনার ইনডেক্স (সিআই) এবং পিউপা ইনডেক্স (পিআই) ব্যবহার করা হয়েছে। এসব সূচকের মাধ্যমে মশার ঘনত্ব ও প্রজনন পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য হটস্পট চিহ্নিত করা হয়।

অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলো হলো: অঞ্চল-১-এর ১৫, ১৬, ১৯, ২০ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ড; অঞ্চল-২-এর ১, ২, ৯, ১১, ১২ ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ড; অঞ্চল-৩-এর ১৪, ২২, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৫৫ ও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড; অঞ্চল-৪-এর ৩১ নম্বর ওয়ার্ড; অঞ্চল-৫-এর ৪৩ ও ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড; অঞ্চল-৭-এর ৭১ নম্বর ওয়ার্ড; অঞ্চল-৯-এর ৬২ ও ৬৫ নম্বর ওয়ার্ড এবং অঞ্চল-১০-এর ৫৮, ৫৯, ৬০ ও ৬১ নম্বর।  

জরিপের ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, চলতি বছর ঢাকা দক্ষিণে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যে রাখতে কাজ করছে সিটি করপোরেশন। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই ঢাকায় প্রথমবারের মতো বিশেষ এডিস মশার লার্ভা জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে।  

তিনি বলেন, জরিপের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে। এর ধারাবাহিকতায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রশাসক আরও বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। প্রতিটি বাড়িতে জমে থাকা পানি অপসারণ করলে ডেঙ্গুর প্রকোপ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এ জন্য বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, ফ্রিজের নিচে এবং আশপাশের ড্রেনে পানি জমতে না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সরকারি ভবনগুলোর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর থেকে সরকারি ভবনের পেছনের অংশসহ বিভিন্ন চত্বর নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে। এসব স্থান দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল।

এ ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকা দক্ষিণের আওতাধীন সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতি শনিবার বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।  

অনুষ্ঠানে ছিলেন ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খয়বর রহমান, সচিব মশিউর রহমান খান, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহাবুবুর রহমান তালুকদার, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান প্রমুখ।