ডেমোক্র্যাটদের জয়ে শেয়ারবাজারে কী প্রভাব পড়বে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ইতিহাস বলছে, নির্বাচনের ফলাফল শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেললেও তা সাধারণত তিন মাসের বেশি স্থায়ী হয় না। এর পর বাজারে এর প্রভাব খুব একটা থাকে না।

ইয়াহু ফাইন্যান্সের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৪৬ সাল থেকে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের অধীনে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ চারভাবে নির্ধারিত হওয়ার সুযোগ ছিল। এর মধ্যে তিন ধরনের ফলাফল আগেও দেখা গেছে। নির্বাচনের এক বছর পর প্রতিটি ক্ষেত্রেই এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক গড়ে ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘ মেয়াদে নির্বাচনের ফলাফল শেয়ারবাজারের গতিপথে বেশি পার্থক্য তৈরি করেনি।


তবে স্বল্প মেয়াদে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। যেসব মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে, এমন সাতটি নির্বাচনের পরবর্তী তিন মাসে শেয়ারবাজার গড়ে ১১ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিবারই সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। অন্যদিকে ২০০২ সালে রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পর তিন মাসে শেয়ারবাজার ৮ শতাংশ কমেছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষে তিন ধরনের ফলাফলের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজার গড়ে ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

সীমিত তথ্য, তাই সতর্ক থাকা জরুরি: তবে এসব পরিসংখ্যানের ভিত্তি বেশি শক্তিশালী নয়। কারণ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের অধীনে ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে সাতবার। প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের এবং সিনেট রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল দুইবার। আর রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল মাত্র একবার। বিপরীতে প্রতিনিধি পরিষদ রিপাবলিকানদের এবং সিনেট ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকার ঘটনা কখনও ঘটেনি।

ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের সাতটি ঘটনার হিসাবেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচবারই নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অর্থাৎ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের অধীনে ডেমোক্র্যাটদের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে মাত্র দুইবার। ১৯৫৪ সালে প্রেসিডেন্ট ডি আইজেনহাওয়ার এবং ২০০৬ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে এমন হয়েছিল। ওই দুই নির্বাচনের পরবর্তী এক বছরে শেয়ারবাজারের সূচক যথাক্রমে প্রায় ৩৩ ও ৭ শতাংশ বেড়েছিল।

তবে নির্বাচনের পর শেয়ারবাজারের গতিপথ সব সময় মসৃণ থাকে না। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছিল। ওই বছরের বড়দিনের আগের দিন পর্যন্ত এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যায়। সে সময় ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াচ্ছিল এবং চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ছিল। পরে অবশ্য বাজার ঘুরে দাঁড়ায়। মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক বছর পর সূচকটি প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছিল।

অন্যদিকে, ২০০৬ সালে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। ফলে ২০০৯ সালে বুশের প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় শেয়ারবাজার প্রায় ৩৮ শতাংশ নিচে নেমে গিয়েছিল।

কেন শেয়ারবাজারে বড় প্রভাব ফেলে না: দলীয় নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকুক বা রিপাবলিকানদের হাতে থাকুক কিংবা কংগ্রেস বিভক্ত থাকুক না কেন ১৯৪৬ সাল থেকে অনুষ্ঠিত ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রতিটির এক বছর পরই এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে। নির্বাচনের দিনের বাজারদর থেকে হিসাব করলে গড় বৃদ্ধির হার প্রায় ১৪ শতাংশ। সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯৪৬ সালে, মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। এই ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মেয়াদের একটি বিশেষ সময়ের সম্পর্ক রয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরের শেষ ভাগ থেকে পরের বছর পর্যন্ত শেয়ারবাজার সাধারণত সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকে।

তবু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও শেয়ারবাজারে তার বড় প্রভাব পড়ে না কেন? এর একটি কারণ, ডেমোক্র্যাটরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি তাদের পক্ষে যাবে না। শুল্কনীতি ও যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের মতো বাজারকে প্রভাবিত করার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতেই থাকে।

ইউবিএসের চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসের ফিক্সড ইনকাম বিভাগের প্রধান কার্ট রেইম্যান সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রে বিভক্ত সরকারব্যবস্থা বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সিনেটের বিধিনিষেধ, দলীয় বিভক্তি, প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা এবং আগে থেকেই বড় অঙ্কের বাজেট ঘাটতির কারণে নীতিগত বড় পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত থাকবে।

স্টেট স্ট্রিট গ্লোবাল অ্যাডভাইজরসের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ মাইকেল অ্যারোনও গত আগস্টে এক প্রতিবেদনে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তার ভাষায়, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন মূলত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য নয়, বরং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য।’