তায়েফের রাস্তায় রক্তাক্ত পায়ে হাঁটছেন এক মানুষ। পাথরের আঘাতে তাঁর শরীর ক্ষতবিক্ষত, জুতা রক্তে ভিজে মাটিতে লেগে যাচ্ছে। অথচ এই মানুষটিই কিছুদিন পর আরশের ওপারে গিয়ে দেখা করবেন স্বয়ং আল্লাহর সাথে। ইনিই মুহাম্মদ (সা.)—যাঁর কষ্টের প্রতিটি ফোঁটা রক্ত রূপান্তরিত হয়েছিল সম্মানে।
আজ আমরা জানবো নবুওয়াতের সেই কঠিনতম অধ্যায় সম্পর্কে।
চল্লিশ বছর বয়স। হেরা গুহায় নির্জনে ধ্যানরত মুহাম্মদ (সা.)। হঠাৎ জিবরাইল (আ.) আগমন করলেন, বললেন, পড়ো! তিনি বললেন, আমি পড়তে জানি না। তিনবার একই কথোপকথনের পর অবতীর্ণ হলো সূরা আলাকের প্রথম আয়াত, পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে খাদিজার কাছে ছুটে গেলেন তিনি, বললেন, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও। খাদিজা (রা.) সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আল্লাহ কখনো আপনাকে লাঞ্ছিত করবেন না, কারণ আপনি আত্মীয়ের হক আদায় করেন, অসহায়ের বোঝা বহন করেন।
এরপর তিন বছর ধরে চলল গোপন দাওয়াত। প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করলেন খাদিজা (রা.), তারপর আলী (রা.), আবু বকর (রা.) এবং যায়েদ (রা.)।
আবু বকরের দাওয়াতে ধীরে ধীরে যুক্ত হলেন উসমান, তালহা, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের মতো সম্মানিত ব্যক্তিরা। মুসলিমরা লুকিয়ে নামাজ পড়তেন, গোপনে একত্রিত হতেন—কারণ প্রকাশ্যে এই বার্তা তখনো ছিল বিপজ্জনক।
তৃতীয় বছরে আল্লাহর নির্দেশ এলো, তোমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করো। সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে নবিজি (সা.) সমগ্র কুরাইশকে ডাকলেন, ঘোষণা দিলেন তাওহিদের বার্তা। এতে ক্ষুব্ধ হলো কুরাইশ নেতারা। শুরু হলো নির্যাতন, বিলাল (রা.)-কে উত্তপ্ত বালুতে শুইয়ে বুকে পাথর চাপানো হলো, সুমাইয়া (রা.) হলেন ইসলামের প্রথম শহীদ। নবিজি নিজেও লাঞ্ছনার শিকার হলেন, কিন্তু চাচা আবু তালিব ও আবু বকরের সমর্থনে টিকে রইলেন।
কুরাইশরা যখন কোনোভাবেই দমাতে পারল না, তখন তারা ঘোষণা করল সামাজিক বয়কট, বনু হাশিম গোত্রের সাথে বিয়ে-শাদি, ব্যবসা, এমনকি খাদ্য সরবরাহও বন্ধ। তিন বছর ধরে মুসলিমরা শি'বে আবু তালিব নামক এক সংকীর্ণ উপত্যকায় বন্দি জীবনযাপন করলেন। ক্ষুধায়গাছের পাতা খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়েছিল, শিশুদের কান্না শোনা যেত ক্ষুধার যন্ত্রণায়।
বয়কট শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই, নবুওয়াতের দশম বছরে, একে একে চলে গেলেন তাঁর দুই মহান আশ্রয়দাতা, চাচা আবু তালিব এবং প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.)। এই বছরকে বলা হয় আমুল হুযন, দুঃখের বছর। যিনি পঁচিশ বছর ধরে সবচেয়ে বড় সহায় ছিলেন, সেই খাদিজাকে হারানোর বেদনা নবিজিকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল।
মক্কায় যখন সমর্থনহীন, তখন নবিজি (সা.) গেলেন তায়েফে, আশা নিয়ে যে হয়তো সেখানকার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করবে। কিন্তু তায়েফবাসী তাঁকে উপহাস করল, শিশুদের লেলিয়ে দিল পাথর ছুঁড়তে। রক্তাক্ত পায়ে তিনি ফিরছিলেন, তখনই আল্লাহ পাঠালেন পাহাড়ের ফেরেশতা, প্রস্তাব দিলেন দুই পাহাড় একত্র করে তায়েফবাসীকে ধ্বংস করার। কিন্তু নবিজি বললেন, না, আমি আশা করি তাদের বংশধর থেকে একদিন এমন মানুষ আসবে যারা আল্লাহর ইবাদত করবে।
এই কঠিন সময়েই আল্লাহ তাঁকে সম্মানিত করলেন মিরাজের রাত দিয়ে। মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস, তারপর সপ্তম আসমান পেরিয়ে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত ভ্রমণ করলেন তিনি। সেখানেই উপহার এলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। যে মানুষটি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন, আল্লাহ তাঁকে দিলেন সবচেয়ে বড় সম্মান। এই ঘটনাগুলো আমাদের শেখায়, কষ্টের পরেই আসে স্বস্তি, ধৈর্যের পরেই আসে সম্মান।
জা.অর্থনীতি
