রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন চিকিৎসাসেবায় বাধা না হয়: প্রধানমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক: একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশাজীবী নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী রাজনৈতিকভাবে সচেতন বা সংগঠিত থাকবেন এটি অযৌক্তিক নয়।

তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি না করে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। ড্যাবের চিকিৎসকদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, চিকিৎসকদের মূল দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। প্রচলিত রাজনীতির বাইরে এসে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। শুধু একটি নির্দিষ্ট খাত নয়, দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে এই পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।

শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীতে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

আরও পড়ুন: চিকিৎসক সমাবেশের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও জনবান্ধব করতে সরকার বাস্তবমুখী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্যে সরকার এগোচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই অর্থের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাতে সরকারি-বেসরকারি সব চিকিৎসককে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দেয়া। মানুষের মধ্যে রোগের কারণ, প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সম্পর্কে শুরু থেকেই সচেতনতা তৈরি করা গেলে অনেক রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।

এ প্রসঙ্গে মার্কিন উদ্ভাবক ও ব্যবসায়ী টমাস এডিসনের একটি বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসকের কাজ শুধু ওষুধ দেয়া নয়; বরং রোগীর শরীরের যত্ন, খাদ্যাভ্যাস এবং রোগের কারণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে তাকে সচেতন করে তোলাও চিকিৎসাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে এমন একটি ধারণা এডিসনের বক্তব্যে পাওয়া যায়।

তারেক রহমান বলেন, এই চিন্তার সঙ্গে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যনীতির একটি মিল রয়েছে। রোগ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সরকার আরও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব স্বাস্থ্যকর্মী সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়ে সচেতন করবেন। তবে স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নেতৃত্ব দিতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত বিভিন্ন দাবির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করতে চিকিৎসকদের বেশ কিছু প্রস্তাব সরকারের কাছে এসেছে। এর মধ্যে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে দ্রুত পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের বয়সসীমা ৩২ থেকে ৩৪ বছর করা, অবসরের বয়স ৬১ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করা এবং চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি রয়েছে।

এ ছাড়া উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা, বেসরকারি খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক চিকিৎসকের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও ন্যায্য বেতনকাঠামো এবং রাজধানীকেন্দ্রিক না হয়ে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবিও চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তারেক রহমান বলেন, চিকিৎসকদের এসব দাবি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। তবে একই সঙ্গে সরকারের বর্তমান বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় একটি দুর্বল অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন এবং ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সেই পরিস্থিতি থেকে দেশকে ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে।

আরও পড়ুন: একক ব্যক্তি-গোষ্ঠী নয়, গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক জনগণ: প্রধানমন্ত্রী

দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতির কথাও বক্তব্যে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা রাষ্ট্র, রাজনীতি ও প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনো সক্রিয়। সম্প্রতি একটি চক্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে মানুষের ভোগান্তির কথা সরকার অস্বীকার করছে না উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দেশের মানুষ যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, সরকার তা জানে। তবে অতীতে জ্বালানি খাতে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন প্রকল্প ও নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। নির্দিষ্ট কিছু মহলকে সুবিধা দিতে নেয়া এসব নীতির খেসারত এখন দেশ, জনগণ এবং বর্তমান সরকারকে দিতে হচ্ছে।

জ্বালানি খাতের এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার কাজ শুরু করেছে বলে জানান তিনি। অপরিকল্পিত প্রকল্পগুলো পুনর্বিবেচনা করে কীভাবে জ্বালানি খাতকে সঠিক পরিকল্পনার আওতায় আনা যায় এবং ধীরে ধীরে গ্যাস, পেট্রোলসহ সামগ্রিক জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে বের করে আনা যায়, সে বিষয়ে সরকার পরিকল্পনা করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি সব খাতকে স্বনির্ভর ও সক্ষম করে তুলতে সরকার বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।

স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে সরকার প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করেছে। তবে শুধু বাজেট ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। সরকারি ও বেসরকারি সব চিকিৎসককে সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের যে লক্ষ্য সরকার নিয়েছে, সেটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য চিকিৎসকদের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই বরাদ্দের মাধ্যমে দেশের মানুষ যাতে বাস্তব সুফল পায়, সে জন্য সরকারের পাশাপাশি চিকিৎসকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান বলেন, যত দ্রুত সম্ভব ই-হেলথ চালু করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ ও হাসপাতালের শয্যা বাড়ালেই স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হবে না বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, চিকিৎসকদের সেবার মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। চিকিৎসকরা যদি নিজেদের দায়িত্বের প্রতি নিবেদিত না থাকেন, তাহলে অবকাঠামোগত উন্নয়নও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।

—জা.অর্থনীতি/আরএস