অস্ত্র সংকটের দাবি প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: টানা ১৩ দিন ধরে তীব্র বোমাবর্ষণের পর অবশেষে ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান স্থগিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রাগারের বিপজ্জনক ঘাটতি, ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের তীব্র উদ্বেগের মুখে ট্রাম্প আপাতত কূটনৈতিক আলোচনার পথ বেছে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সিএনএন, বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের পৃথক প্রতিবেদনে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউজ সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার ওভাল অফিসে যুদ্ধ জোরদার করার বিষয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সরাসরি সতর্ক করেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, জেনারেল ড্যান কেইন প্রেসিডেন্টকে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্যাট্রিয়টসহ জরুরি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে।

পেন্টাগনের সামরিক বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, লোহিত সাগরে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা এবং ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণ সহায়তা দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রাগারে আগেই টান পড়েছিল। সাম্প্রতিক টানা ১৩ দিনের ইরানি সংঘাত সেই সংকটকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সামরিক শক্তির এমন ঘাটতির সুযোগ নিয়ে রাশিয়া ইউক্রেনে এবং চীন তাইওয়ানে নতুন পদক্ষেপ নিতে পারে। এর আগে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়ালৎস ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন, ইউক্রেন ও হুতিবিরোধী অভিযানে মার্কিন অস্ত্রাগারে একটি কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে দ্রুত ও উন্নত প্রযুক্তিতে তা নতুন করে গড়ে তোলা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে সিএনএনের খবরে জানানো হয়, কেবল অস্ত্র সংকটই নয়, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ব্যাপক হামলায় অসংখ্য বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু, চরম দুর্ভিক্ষ ও বিদ্যুৎহীনতার মতো মানবিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি এর ফলে নতুন শরণার্থী সংকট তৈরি হওয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর ইরানের পাল্টা হামলার মারাত্মক ঝুঁকি ছিল। ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন এবিসি নিউজের এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এক অর্থহীন যুদ্ধে জড়িয়ে নিজের মূল্যবান আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্রের অপচয় করছে, যা সেনাদের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।

তবে অস্ত্রের মজুদ শেষ হওয়ার গুঞ্জন পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় আমাদের কাছে অনেক বেশি গোলাবারুদ রয়েছে। প্রয়োজনের চেয়েও আমাদের মজুদ বেশি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ খোলা আছে— হামলা বহুগুণ বাড়িয়ে ইরানের সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়া, অথবা একটি চুক্তিতে পৌঁছানো।’ তিনি জানান, কূটনৈতিক আলোচনায় বর্তমানে ইরানকে আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর মনে হচ্ছে। হোয়াইট হাউজের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেংও একই সুর মিলিয়ে জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধান পছন্দ করলেও ইরান আগ্রাসন চালালে সব ধরনের সামরিক পদক্ষেপের পথ খোলা রাখবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস ও সরকার পতনের লক্ষ্য নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভিযান শুরু করলেও পাঁচ মাস পর এসে ট্রাম্প নিজেকে এক জটিল ফাঁদে আবিষ্কার করেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৯ শতাংশ জনগণের সমর্থন রয়েছে, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর নিজস্ব দলেও প্রবল রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং বিশাল রাজনৈতিক ক্ষতি থেকে বাঁচতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ থেকে একটি সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খুঁজছেন।