আনোয়ারায় চীনা ইকোনমিক জোন নির্মাণকাজ শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের (সিইআইজেড) নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে। গতকাল সোমবার প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এর মাধ্যমে এক দশকের স্থবিরতা কাটিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো প্রকল্পটির কাজ।

এ দিন আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায় প্রস্তাবিত ‘চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও অবকাঠামো নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় তিনি বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর চিপসহ উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর ও কৌশলগত শিল্পে বিনিয়োগের জন্য চীনা বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানান। 

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আমীর খসরু বলেন, তৈরি পোশাক বা উৎপাদন খাতের পাশাপাশি এখন সময় এসেছে আরও উন্নত প্রযুক্তি ও কৌশলগত শিল্পে বিনিয়োগের। সেমিকন্ডাক্টর চিপসহ আরও অনেক উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প বাংলাদেশে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু বিনিয়োগ চায় না; প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য অর্জনে এই বিনিয়োগই হবে প্রধান চালিকাশক্তি।

তার ভাষ্য, এই শিল্পাঞ্চলে বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখবে। এই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে আমীর খসরু বলেন, সরকার নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সেইসঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ দূর করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন সপ্তাহে সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত। বিনিয়োগকারীদের সেবা দিতে শিগগিরিই ‘সিঙ্গেল উইন্ডো সার্ভিস’ চালুর ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, এর পরিকল্পনা ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে।

মন্ত্রী আরও জানান, মূলধন ও অর্জিত মুনাফা নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা আরও সহজ করা হচ্ছে। অতীতে এটি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেও এখন বিনিয়োগকারীরা সহজেই অর্থ নিয়ে যেতে পারবেন।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে চীনা বিনিয়োগকারীদের তালিকাভুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে কোম্পানিগুলো সহজে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে এবং দেশের সাধারণ মানুষ এসব প্রকল্পের অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাবে। এটি উচ্চ সুদে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হবে। 


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত। আর এ বিষয়ে সরকার আন্তরিক। আজকের গ্রাউন্ডব্রেকিং শুধু নির্মাণকাজের সূচনা নয়; বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সেতুবন্ধনের ভিত্তি। একসঙ্গে এমন একটি জোন গড়ে তুলতে চায় সরকার, যা নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে, টেকসই প্রবৃদ্ধি এগিয়ে নেবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ তৈরি করবে।


বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং ও দালিয়ান সফরের পর ৩০টির বেশি চীনা কোম্পানি এই জোনে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশে একটি কারখানা স্থাপন বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে ছয় মাস থেকে এক বছর লেগে যায়। এই জটিলতা নিরসনে আগামী তিন মাসের মধ্যে এমন একটি প্রক্রিয়া চালু করা হবে, যার মাধ্যমে ব্যবসা শুরুর কাজ ১৪ দিনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে এটি একটি বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।


বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে। জিটুজি উদ্যোগের আওতায় বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি বাংলাদেশে বৃহৎ পরিসরের চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আধুনিক শিল্প অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতায় এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।