মুজিবনগর হাসপাতালে রোগীদের খাবারে অনিয়মের অভিযোগ
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

মেহেরপুর প্রতিনিধি: মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রোগীদের সরকারি বরাদ্দের খাবার নিয়ে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কাগজে-কলমে পুষ্টিকর ও উন্নতমানের খাবার সরবরাহের তালিকা থাকলেও, বাস্তবে রোগীদের পাতে দেওয়া হচ্ছে নামমাত্র ও নিম্নমানের খাবার। ওজনে কম দেওয়া থেকে শুরু করে বাজারমূল্যের চেয়ে দুই-তিন গুণ বেশি দাম দেখিয়ে সরকারি অর্থ লোপাটের সত্যতা মিলেছে সরেজমিন অনুসন্ধানে।

জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হাসপাতালের খাবার সরবরাহের কাজটি পায় 'আদিল ট্রেডার্স' নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাজ পাওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিম্নমানের খাবার ও ওজনে কম দিয়ে রোগীদের সাথে প্রতারণা করে আসছে। হাসপাতালের খাদ্য সরবরাহ নীতি অনুযায়ী, প্রতিদিন রোগী প্রতি ২৮৮ গ্রাম ব্রয়লার মুরগির মাংস, ৭৫ গ্রাম খাসির মাংস ও ২৫০ গ্রাম রুই মাছ দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রোগীদের পাতে যে মাছ বা মাংস দেওয়া হচ্ছে তা ওজনে ১০০ গ্রামও পার হয় না। শুধু ওজনে কম নয়, রান্নায় যে সবজি ব্যবহার করা হচ্ছে তা দুই-তিন দিনের পুরোনো ও বাসি। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন টাটকা সবজি দেওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান তিন থেকে পাঁচ দিন পর পর কাঁচা সবজি সরবরাহ করে। আর দুপুরের খাবারের জন্য যে চালের ভাত রান্না হয়, তাও অত্যন্ত নিম্নমানের।

লুটপাটের সবচেয়ে বড় নজির মিলেছে ভাতের চালে ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যে। দুপুরের ভাতের জন্য ব্যবহৃত প্রতি কেজি চালের মূল্য ধরা হয়েছে ৭৪ টাকা, যার স্থানীয় বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ৪০-৪৫ টাকা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, কম মূল্যের রেশনের চাল আলাদাভাবে সাধারণ বস্তায় ভরে এনে হাসপাতালে সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া সকালের নাস্তায় মাত্র ৫৫ গ্রাম ওজনের একটি বেনামী পাউরুটির মূল্য ধরা হয়েছে ১৪ টাকা। একটি কলার সর্বোচ্চ দাম ৫ টাকা হলেও মূল্য ধরা হয়েছে ৭ টাকা এবং বাজারে যে ডিমের দাম ৯ থেকে ১০ টাকা, তার মূল্য দেখানো হয়েছে ১৫ টাকা। একই সাথে প্রতিদিন সকালে নাস্তার সঙ্গে রোগীদের ৫ গ্রাম করে চিনি দেওয়ার সরকারি বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে তা দেওয়া হয় না। খাদ্য তালিকায় বোতলজাত সয়াবিন তেলের কথা উল্লেখ থাকলেও, বাস্তবে রান্নায় ব্যবহার করা হচ্ছে সস্তা খোলা তেল।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী খাদ্য সরবরাহ প্রক্রিয়াটি প্রতিদিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কঠোরভাবে তদারকি করার কথা থাকলেও কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতার সুযোগ নিচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে খাবার সরবরাহকারী সাফায়েতের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, "খাবারের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না, আমি শুধুমাত্র পৌঁছে দিই।" তবে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, আদিল ট্রেডার্সের নামে সাফায়েত নিজেই এই খাবার সরবরাহ করছেন।

মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তত্ত্বাবধায়ক আসাদুজ্জামান বলেন, "রান্নায় বাসি সবজি এবং মাছ ওজনে কম দেওয়ার বিষয়টি সাপ্লায়ারদের গাফিলতির কারণেই হয়েছে। আমাদের ডাক্তাররা রোগী দেখার কারণে মাঝে মাঝে হয়তো ঠিকভাবে মনিটরিং করতে পারেন না। তবে আমরা মনিটরিং আরও বাড়াবো। ভবিষ্যতে যেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান খারাপ মানের খাবার বা ওজনে কম দিতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা সচেষ্ট থাকবো।" ঐতিহাসিক মুজিবনগর উপজেলার একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে চিকিৎসা নিতে আসা দরিদ্র ও সাধারণ রোগীদের খাবার নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার পেছনে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী রোগী ও এলাকাবাসী।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি