ফুটবলের ইতিহাসে কিছু গল্প থাকে যেগুলো শুধু ম্যাচের ফল নয়, বরং বদলে দেয় পুরো একটি জীবন! লিওনেল মেসির ক্ষেত্রে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ছিল ঠিক তেমনই এক অধ্যায়— যেখানে দীর্ঘ অপেক্ষা, ব্যর্থতার স্মৃতি আর ব্যক্তিগত মহাকাব্য মিলেমিশে শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় পূর্ণতার গল্পে।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২ শুরু হয়েছিল কাতারে, কিন্তু শেষ হয়েছিল মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন রাতে। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে এই টুর্নামেন্ট ছিল তার শেষ বিশ্বকাপ— এ কথা তিনি আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। তাই প্রতিটি ম্যাচ ছিল যেন বিদায়ের একেকটি ধাপ, আর প্রতিটি গোল ছিল একেকটি অধ্যায় বন্ধ করার মতো।
মেসির জন্ম ১৯৮৭ সালে আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন প্রতিভার বিস্ময়, কিন্তু শারীরিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যার কারণে ক্যারিয়ারের শুরুতেই চিকিৎসার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। সেই সংকট পেরিয়ে তিনি যোগ দেন স্পেনের ক্লাব বার্সেলোনাতে, যেখানে তিনি গড়ে তোলেন আধুনিক ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্যারিয়ার।
ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য শিরোপা জিতলেও একটি প্রশ্ন সবসময় ঘুরে বেড়াত- ‘বিশ্বকাপ কবে?’ জাতীয় দলের হয়ে একাধিকবার ফাইনালে গিয়ে হেরে যাওয়া, বিশেষ করে ২০১৪ সালের ফাইনালে পরাজয়, মেসিকে এক ধরনের অসম্পূর্ণ কিংবদন্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল অনেকের চোখে।
কিন্তু ২০২২ বিশ্বকাপে সেই অসম্পূর্ণতার গল্প বদলাতে শুরু করে। আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্টে প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হেরে গিয়ে বড় ধাক্কা খায়। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, হয়তো আবারও ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। কিন্তু মেসির নেতৃত্বে দলটি ধীরে ধীরে ফিরে আসে।
গ্রুপ পর্বের পর আর্জেন্টিনা হয়ে ওঠে এক ভিন্ন দল-আরও সংগঠিত, আরও আত্মবিশ্বাসী। মেসি শুধু গোল করেননি, বরং পুরো দলের আক্রমণ এবং মানসিকতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলেন। তার পাশে দাঁড়ান তরুণ তারকারা, বিশেষ করে জুলিয়ান আলভারেজ, যিনি আক্রমণে নতুন গতি আনেন।
নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনা হারায় অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস এবং ক্রোয়েশিয়াকে। প্রতিটি ম্যাচেই মেসি ছিলেন অনুপ্রেরণা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেন্দ্র। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে তার অ্যাসিস্ট এবং গোল ফুটবল বিশ্লেষকদের চোখে ছিল এক পূর্ণাঙ্গ অধিনায়কের প্রতিচ্ছবি।
ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল ফ্রান্স-আরেকটি শক্তিশালী দল, যার নেতৃত্বে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ম্যাচটি হয়ে ওঠে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে নাটকীয় ফাইনালগুলোর একটি। আর্জেন্টিনা ২–০ গোলে এগিয়ে যায়, মেসি গোল করেন পেনাল্টি থেকে, এরপর আলভারেজ বাড়ান ব্যবধান।
কিন্তু এমবাপ্পের অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিকে ম্যাচ ৩–৩ হয়ে যায়। পুরো ফুটবল বিশ্ব তখন স্তব্ধ। অতিরিক্ত সময়ে মেসি আবারও এগিয়ে দেন আর্জেন্টিনাকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে।
সেখানে আর্জেন্টিনা জয়ী হয় ৪–২ ব্যবধানে। আর সেই মুহূর্তে ইতিহাসের এক দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে। মেসি ট্রফি হাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে যে দৃশ্য তৈরি করেন, তা শুধু একটি দেশের জয় ছিল না— ছিল একজন মানুষের জীবনের পূর্ণতা। বহু বছর ধরে যাকে অসম্পূর্ণ কিংবদন্তি বলা হয়েছে, তিনি সেই রাতেই হয়ে ওঠেন সম্পূর্ণ!
মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা জেতে ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ। গোল্ডেন বল জেতেন এই লিজেন্ড। যে বিশ্বকাপে ৭টি গোল করেন তিনি। তার পথ ধরেই তাকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় বলা হয়। ২০২৩ সালে ক্লাব ও জাতীয় দলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় তাকে ফিফা বর্ষসেরার পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়। মেসি তার খেলোয়াড়ি জীবনে সব কিছুই অর্জন করেছেন যা একজন সর্বকালের সেরার জন্য জরুরি! একই খেলার ধরন ও দৈহিক উচ্চতার কারণে মেসিকে প্রায়ই তারই গুরু লিজেন্ড ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করা হয়। মেসি অন্যান্য খেলোয়াড়ের তুলনায় অধিক ক্ষিপ্র এবং তিনি অতি দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন এনে যেন তাকেই এক দিক থেকে গেলেন ছাড়িয়ে!
এই বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে মেসি আর শুধু একজন অসাধারণ ফুটবলার থাকেননি— তিনি হয়ে ওঠেন সেই প্রতীক, যিনি ব্যর্থতার পরও থামেন না এবং শেষ পর্যন্ত নিজের গল্প নিজেই লিখে যান।
কাতারের সেই রাত তাই শুধু আর্জেন্টিনার জয় নয়— তা ছিল মেসির দীর্ঘ যাত্রার সমাপ্তি, যেখানে প্রতিটি ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত এক মহাকাব্যিক বিজয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
একনজরে
নাম: লিওনেল আন্দ্রেস মেসি
জন্ম: ২৪ জুন ১৯৮৭
জন্মস্থান: রোজারিও, আর্জেন্টিনা
জাতীয়তা: আর্জেন্টাইন
উচ্চতা: প্রায় ১.৭০ মিটার
পজিশন: ফরোয়ার্ড /অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার
খেলার ধরন: ড্রিবলিং, প্লেমেকিং ও গোলস্কোরিং দক্ষতাসম্পন্ন আধুনিক অ্যাটাকার
ক্লাব ক্যারিয়ার
প্রথম পেশাদার ক্লাব: বার্সেলোনা (২০০৪-২০২১)
বার্সেলোনায় সময়কাল: ক্লাব ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও অসংখ্য শিরোপাজয়ী
পরবর্তী ক্লাব: প্যারিস সাঁ জার্মেইন (২০২১-২০২৩)
বর্তমান ক্লাব: ইন্টার মায়ামি সিএফ (২০২৩-বর্তমান)
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার (আর্জেন্টিনা)
জাতীয় দলে অভিষেক: ২০০৫
অধিনায়কত্ব: বহু বছর আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের অধিনায়ক
বড় অর্জন
কোপা আমেরিকা জয় ২০২১ ও ২০২৪
ফিফা বিশ্বকাপ জয়: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২
গোল্ডেন বল: ২০১৪, ২০২২
বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার: একাধিক আসরে অংশগ্রহণ (২০০৬-২০২২)
ব্যক্তিগত অর্জন
ব্যালন ডি’অর জয়ী: (৮টি) ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৫, ২০১৯ এবং ২০২১ ও ২০২৩
আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা: ১০৪ গোল (১৭৭ ম্যাচে)
